ব্যাংকে টাকা রাখার সময় আমরা ধরে নিই, ওটা নিরাপদ। কিন্তু সেই ব্যাংকই যদি ঋণের টাকা ফেরত না পায়, আর ক্ষতি পোষানোর মতো পুঁজিও না থাকে, তখন আমাদের টাকার কী হবে?
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে এসেছে শূন্যের নিচে, ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। সহজ করে বললে, ব্যাংকগুলোর জমানো মূলধনের পুরোটাই লোকসানে গিয়ে ঠেকেছে।
একই সময়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণের বোঝাও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই আর ফেরত আসছে না।
দেশের ব্যাংক খাতের সমস্যা এখন আর শুধু খেলাপি ঋণের নয়, টিকে থাকার।প্রশ্ন হচ্ছে, এই অবস্থার জন্য দায়ী কারা?
তিন মাসে ঋণখেলাপি ১৭ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী জুন শেষে খেলাপি ঋণ ৬,০৬,৫৫৫ কোটি টাকা। মার্চে ছিল ৫,৮৮,৭০৪ কোটি টাকা, অর্থাৎ তিন মাসে ১৭,৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ৫,৫৭,২১৭ কোটি টাকা, ফলে ছয় মাসে বেড়েছে ৪৯,৩৩৮ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণের বাইরের ঝুঁকিও বড়। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুনঃতফসিল করা ঋণ ২ দশমিক ৬৯ লাখ কোটি, হাইকোর্টের স্থগিতাদেশে আটকে থাকা ১ দশমিক ৮২ লাখ কোটি এবং অবলোপন করা ৮৩ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ১০ দশমিক ৯৩ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।
মূলধনের অবস্থা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে খারাপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংক খাতের সিআরএআর ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ভারতে এটি ১৭ দশমিক ২০, শ্রীলঙ্কায় ১৯ দশমিক ৪০ এবং পাকিস্তানে ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ। বেসেল-৩ অনুযায়ী,ন্যূনতম ১০ শতাংশের সঙ্গে ২ দশমিক ৫ শতাংশ বাফার রাখতে হয়।
২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ, আর ২০২৩ সালে ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ইউএনবির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চে এটি আরও নেমে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে ঠেকেছে। একই সময়ে ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ২ দশমিক ৯৪ লাখ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণে বিশ্ব তুলনাও অস্বস্তিকর। চীনে খেলাপি ঋণের হার মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ, আর এশিয়ার গড় ১ দশমিক ৬ শতাংশ। চীনও একসময় এই সংকটে ছিল। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ২০০২ সালে দেশটির খেলাপি ঋণ ছিল ২৬ শতাংশ। সব দেশের চিত্র দেখলে বোঝা যায়, বড় ধাক্কা কাটানো সম্ভব, তবে সময় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা লাগে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে ইসলামী ও চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক
ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং সেক্টর আপডেটে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ২০২৬ সালের মার্চে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ, এক বছর আগে ছিল ২৯ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া নয়টি ব্যাংকে হার ৫২ দশমিক ২ শতাংশ, আগের বছর ছিল ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকগুলোর এডিআর ১২০ দশমিক ৩ শতাংশ, অর্থাৎ ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে প্রায় ১২০ টাকা ঋণ। মানে আমানতের চেয়ে বেশি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
ছয় গোষ্ঠীর ঋণঝুঁকি: সমস্যা শুধু কয়েকজন খেলাপির নয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ নথি “Selected Lead Banks, Impacted by Six Groups”-এ ছয়টি ব্যবসায়ী গ্রুপের খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গ্রুপগুলো হলো সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন। UNB-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি গ্রুপের জন্য একটি করে লিড ব্যাংক ঠিক করা হয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে ঋণ আদায়ের চেষ্টা চালাবে। দায়িত্ব ভাগ হয়েছে এভাবে: সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও ওরিয়নের লিড ব্যাংক ইউসিবি, এস আলমের ইসলামী ব্যাংক, বেক্সিমকো ও নাসার ন্যাশনাল ব্যাংক এবং সিকদারের আইএফআইসি।
নিজের প্রতিষ্ঠানকে নিজের ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়াকে সম্পর্কিত পক্ষে ঋণ (related party lending) বলে, যা পরিবার-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকে ঝুঁকির একটি প্রধান পথ। গভর্নর আহসান এইচ মনসুর অভিযোগ করেছেন, পরিবার-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকের মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে পাচার হয়েছে।
পাঁচ ব্যাংক এক হলো
এক্সিম, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী মিলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হয়েছে, আর সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন দিচ্ছে। নিরীক্ষায় খেলাপি ঋণের হার ধরা পড়েছিল ফার্স্ট সিকিউরিটিতে ৯৬ দশমিক ৩৭, ইউনিয়নে ৯৭ দশমিক ৮, গ্লোবালে ৯৫, সোশ্যালে ৬২ দশমিক ৩ এবং এক্সিমে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। একীভূতকরণ কার্যকর হয়েছে ২০২৬ সালের শুরু থেকে।
ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় একীভূতকরণ কার্যকর হয়েছে ২০২৬ সালের শুরু থেকে। ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সুরক্ষিত, আর কোনো কর্মীর চাকরি যাবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ১৫ হাজার কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তর করা হচ্ছে।
সরকারি মূলধন ঢুকিয়েও চাপ কমেনি। সর্বশেষ ইউএনবিএর ভাষ্য অনুযায়ী মার্চ শেষে খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ।
সমাধানের নতুন কঠোর পথ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কৌশলে মূলধন ঘাটতি না মেটালে পরিচালকরা মালিকানা হারাবেন এবং পরবর্তী পাঁচ বছর কোনো ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না। লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের শেষে খেলাপি হার ২০ শতাংশে এবং ২০২৭ সালের শেষে ১০ শতাংশে নামানো। ঋণখেলাপিদের নাম ও ছবি বিমানবন্দর এবং ব্যাংকের কার্যালয়ে প্রকাশের পরিকল্পনাও আছে। সুতরাং আপনার “মালিকানা আদায়” কথাটি মালিকানা বাজেয়াপ্ত করা অর্থে ঠিক।
ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়,ব্যাংকের সংখ্যা কমানো নিয়ে গভর্নর বলেছেন, ৬১টি ব্যাংক প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি, ১০ থেকে ১৫টিই যথেষ্ট।
২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুবিধা আরও বাড়িয়েছে। ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণগ্রহীতারা ১৫ বছর পর্যন্ত সময় পাবেন, তাতে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড আছে।
পরিচালনা পর্ষদ আইনের টানাপোড়েন
২০১৮ সালে পরিচালকের মেয়াদ ৬ থেকে ৯ বছর এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা ২ থেকে ৪ জন করা হয়। ২০২৩ সালে মেয়াদ বেড়ে ১২ বছর হয়, আর পরিবারের সদস্য কমে ৩ জন। বাংলাদেশ ব্যাংকের খসড়ায় পরিবারের সদস্য ২ জন এবং মেয়াদ ৬ বছরের প্রস্তাব এসেছিল। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২০ সেপ্টেম্বরের এক সভায় প্রাথমিকভাবে ৩ জন ও ৯ বছরের পক্ষে মত দেয়।কিন্তু কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর ঘোষণার পাশাপাশি এতে কাঠামোগত সংস্কারে ঢিলেমির ইঙ্গিত মিলছে।
ব্যাংক বাঁচানোর খরচ নয়, জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
প্রথমত, ব্যাংকের সংখ্যা কমানো এক বিষয়, আর ঋণ আদায় করা আরেক বিষয়। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কাগজে খেলাপি ঋণের হার কমানো গেলেও ব্যাংকে টাকা ফেরত আসে না। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩১ শতাংশে নেমেছিল, যার পেছনে ব্যাপক পুনঃতফসিলের ভূমিকা ছিল। কিন্তু তিন মাস পরই তা আবার বেড়েছে। অর্থাৎ ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়ে সাময়িকভাবে হিসাবের চিত্র বদলানো সম্ভব হলেও, প্রকৃত ঋণ আদায় নিশ্চিত না হলে সংকট থেকেই যাবে। তাই খেলাপি ঋণের হার কমানোর পাশাপাশি কত টাকা আদায় হলো, কত ঋণ নিয়মিতভাবে পরিশোধ হচ্ছে এবং কত টাকা অনাদায়ি রয়ে গেছে, তারও স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাতের সংকটের মূল শিকড় মালিকানা ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতায়। একই পরিবারের হাতে দীর্ঘদিন ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ থাকা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলে ঝুঁকি বাড়ে। এ পরিস্থিতিতে শুধু নতুন মূলধন জোগানো কিংবা দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে কাঠামো বদলালে স্থায়ী সমাধান আসবে না। পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অনিয়মের জন্য মালিক ও পরিচালকদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
তৃতীয়ত, ব্যাংকের সংখ্যা কমানো কিংবা দুর্বল ব্যাংকে রাষ্ট্রীয় মূলধন জোগানোর আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর পড়তে পারে। সরকারি অর্থ ব্যবহার করা হলে সেই অর্থের উৎস, ব্যবহারের শর্ত এবং ভবিষ্যতে তা কীভাবে ফেরত আসবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ব্যাংক বাঁচানোর নামে পুরোনো মালিকদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। তাই পুনর্গঠন বা একীভূতকরণের আগে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ, দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ এবং ঋণ আদায়ের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা দরকার। জনগণের অর্থ দিয়ে ব্যাংককে সহায়তা করা হলে সেই অর্থের সুরক্ষা ও ব্যবহারের জন্যও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

