ঢালাও হিসাব জব্দ ও ব্যাংক বোর্ড ভেঙে দেওয়ার প্রবণতা-রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে, প্রশ্ন উঠছে ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে।
মজুরি আন্দোলনে তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতা শুরু হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অর্থায়নের সন্দেহে ১০০ ব্যাক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং ১২৫ প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য তলব করেছে। সরকারের দাবি, অস্থিরতার পেছনে সংগঠিত রাজনৈতিক অর্থায়ন আছে। তার সাথে এই তালিকা আরও বাড়তে পারে আর কবে শেষ হবে তা কর্মকর্তারা বলতে পারেননি। এমনকি ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেনে ঘতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, নির্দোষ ও রাজনীতিমুক্ত ব্যবসায়ীরাও ঢালাওভাবে তালিকায় এসেছেন। তালিকায় এমন ব্যবসায়ীরও নাম রয়েছে, যাদের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কেউ দোষী হলে তার বিচার অবশ্যই হোক, কিন্তু প্রমাণের আগেই হিসাব আটকে গেলে ক্ষতিটা শুধু মালিকের একার নয়, কারখানার হাজার হাজার শ্রমিকেরও।
রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব জব্দ করার ঘটনা নতুন নয়। ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রায় তিনশ হিসাব জব্দ করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে চারশর বেশি। ২০২৪ সালের আগস্টের পর প্রথম কয়েক মাসেই ৩৬৬ জনের ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দ হয়। সরকার বদলেছে, নাম বদলেছে, কিন্তু ঘটনাটা থেকে গেছে: আগে হিসাব জব্দ যায়, প্রমাণ আসে পরে, আর মুক্তি আসতে লাগে কখনো কয়েক বছর। এবারও প্রশ্নটা সেই একই জায়গায়।
অন্যের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দায় পড়ছে ব্যবসায়ীদের উপর
এনবিআরের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ভোক্তভোগী দেশের প্রতিষ্ঠিত ও রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা। যাদের সুনামের সাথে জড়িত আছে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যবসা।
শেলটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ ও তার মা রাশিদা আহমেদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত শেল্টেক্ গ্রুপের দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ ব্যবসায়ী তানভীর আহমেদের সুনাম রয়েছে ব্যবসায়ী মহলে। তবে তাদের পরিবার একসময় সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদীর এনভয় গ্রুপের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদার ছিল। প্রায় সাড়ে চার বছর আগে ব্যবসায়িক সম্পর্কের অবসান হলেও পুরোনো অংশীদারত্বের সূত্র ধরে তাদের নাম তদন্তের আওতায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম মোশাররফ হোসেন, আতিকুর রহমান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসনাত মোশাররফসহ আটজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে এনবিআর। গ্রুপটির তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবও তলব করা হয়েছে। তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসনাত মোশাররফ বলেন, তাদের পরিবারের কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমান তুসুকা গ্রুপের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সূত্র ধরে গ্রুপটির পরিচালক আরশাদ জামাল, রেফায়েত উল্লাহ ও ফিরোজ আলমসহ নয়জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। গ্রুপটির ১০টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবও তলব করা হয়েছে। তুসুকা গ্রুপের পরিচালক বলেন, চার উদ্যোক্তার মধ্যে তিনজনেরই কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। তারপরও তাদের হিসাব জব্দ করে কর্মীদের বেতন পরিশোধে জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে।কারখানাগুলোতে কাজ করেন ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক। এক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে এক থেকে দেড় কোটি টাকা।
এনবিআরের পাওয়া ১১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকায় ৬৭ জন ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন সাবেক সংসদ সদস্য এবং দুজন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের পদে ছিলেন। তাদের পরিবারের সদস্য ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের নামও তালিকায় এসেছে। বাকি ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কোনো স্পষ্টত প্রমাণ নেই।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হকের বক্তব্যেও এই উদ্বেগের প্রতিফলন রয়েছে। তার মতে, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি নেই। তবে যথাযথ যাচাই ছাড়া ঢালাওভাবে হিসাব জব্দ ও তথ্য তলব করা হলে নিরপরাধ উদ্যোক্তারা হয়রানির শিকার হতে পারেন।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় নজরদারির কেন্দ্র
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন বড় শিল্পগোষ্ঠী এখন এনবিআরের আর্থিক অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু। তালিকায় রয়েছে সিপাল গ্রুপ যার প্রতিষ্ঠাতা সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও হামিদ গ্রুপের কর্ণধার নসরুল হামিদ এবং সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রেনেসাঁ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শাহরিয়ার আলম।
মণ্ডল গ্রুপের ২৮টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব এবং চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডলসহ ১৯ জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে।আবদুল মমিন মণ্ডল আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য।২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রুপটি ৫৬ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে; কর্মী রয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার।
চট্টগ্রামের ওয়েল গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলবের পাশাপাশি চেয়ারম্যান আবদুস সালামসহ ১১ জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। আবদুস সালাম চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। তার ভাই সৈয়দ নুরুল ইসলাম আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপদেষ্টা ছিলেন।
এ ছাড়া গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ চারজন এবং নিপা গ্রুপের চেয়ারম্যান খসরু চৌধুরীসহ চারজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। খসরু চৌধুরী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম আবদুল মান্নান ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের হিসাবও জব্দ করেছে এনবিআর।
তাই প্রশ্ন থেকেই যায়। যাদের রাজনৈতিক পরিচয় আছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ কোথায়? আর যাদের নেই, তাদের নাম তালিকায় কেন? দুটোরই উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। উত্তর না মেলা পর্যন্ত নির্দোষ উদ্যোক্তারা আর কারখানার শ্রমিকেরা অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবেন।

