যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির ফলে ভারতের অর্থনীতি এক নতুন সংকটে পড়েছে। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি অব্যাহত রাখায় ট্রাম্প ভারতের ওপর মোট ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করেছেন, যা দেশটির রপ্তানিখাতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।
গত ৬ আগস্ট (বুধবার) ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ভারতের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসিয়েছেন। এর আগে ৩১ জুলাই ভারতীয় পণ্যের ওপর আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেছিলেন। দুই দফার মিলিত শুল্ক হার এখন ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও চীন, তুরস্ক কিংবা অন্যান্য রুশ তেল আমদানিকারক দেশ এই শুল্কের আওতায় পড়েনি।
নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প বলেন, ‘ভারত সরকার রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। তাই বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলো।’এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে দুটি ধাপে—৭ আগস্ট সকাল ৯:৩০ থেকে প্রথম ধাপ, দ্বিতীয় ধাপ শুরু হবে ২৭ আগস্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই শুল্ক আরোপ কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। এটি ভারতকে বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মানতে বাধ্য করার একটি চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কোন খাত কতটা ক্ষতিগ্রস্ত?
ভারতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত এই উচ্চ শুল্কের আওতায় পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক (১০.৩ বিলিয়ন ডলার)
- রত্ন ও গয়না (১২ বিলিয়ন ডলার)
- চিংড়ি ও সামুদ্রিক খাদ্য (২.২৪ বিলিয়ন ডলার)
- চামড়া ও জুতা (১.১৮ বিলিয়ন ডলার)
- রাসায়নিক (২.৩৪ বিলিয়ন ডলার)
- যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিপণ্য (প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার)
নতুন শুল্ক হার অনুযায়ী, রপ্তানিপণ্যে শুল্কের হার দাঁড়াচ্ছে:
- জৈব রাসায়নিক: ৫৪%
- কার্পেট: ৫২.৯%
- নিট পোশাক: ৬৩.৯%
- বোনা পোশাক: ৬০.৩%
- হীরা ও স্বর্ণপণ্য: ৫২.১%
- যন্ত্রপাতি: ৫১.৩%
- আসবাবপত্র: ৫২.৩%
রপ্তানিকারকদের শঙ্কা:
চিংড়ি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেগা মোডার এমডি যোগেশ গুপ্ত বলেন, “ইকুয়েডরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা অসম হয়ে যাচ্ছে। তাদের ওপর মাত্র ১৫ শতাংশ শুল্ক, আর আমাদের ৩৩.২৬ শতাংশ। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।” বস্ত্র খাতের শীর্ষ সংগঠন সিআইটিআই একে “গভীর উদ্বেগজনক” বলে উল্লেখ করে জানিয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভারত পিছিয়ে পড়বে।
গয়না রপ্তানিকারক কামা জুয়েলারির এমডি কলিন শাহ বলেন, “প্রায় ৫৫% রপ্তানি এই শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রপ্তানিকারকেরা ৩০-৩৫% বেশি ব্যয়ে পড়বেন। ইতিমধ্যে অনেক অর্ডার বাতিল হয়েছে।” গ্রোমোর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড–এর এমডি যাদবেন্দ্র সিং সচান বলেন, “এই পরিস্থিতিতে আমাদের নতুন বাজার খুঁজতেই হবে।”

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচিত্র:
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩১.৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি ৮৬.৫ বিলিয়ন ডলার ও আমদানি ৪৫.৩ বিলিয়ন ডলার। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বেশিরভাগ পণ্যই শুল্কের বাইরে ছিল। এখন শুল্ক আরোপে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
কোন কোন পণ্য শুল্কমুক্ত থাকছে? এই উচ্চ শুল্কের বাইরে রয়েছে:
- ওষুধ ও চিকিৎসা পণ্য
- জ্বালানি সম্পদ (তেল, গ্যাস, কয়লা)
- স্মার্টফোন, কম্পিউটার, চিপসেট
- গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ, তবে এগুলোর রপ্তানিমূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় সামগ্রিকভাবে ভারতীয় রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই শুল্ক আরোপকে ‘অন্যায্য ও অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছে। তারা জানিয়েছে, ১.৪ বিলিয়ন মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের এই তেল কেনা জরুরি। তাদের মতে, একই ধরনের পদক্ষেপ নিলেও অন্য দেশগুলোর ওপর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ভারত জানিয়েছে, তারা প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেবে এবং জাতীয় স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নেবে।
রাশিয়ার কাছ থেকে কত তেল কেনে ভারত?
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত রাশিয়া থেকে প্রায় ৫ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা (৩৮ বিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের তেল আমদানি করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে ভারত গড়ে ১৭.৫ লাখ ব্যারেল তেল রাশিয়া থেকে আমদানি করেছে, যা দেশটির মোট চাহিদার ৩৫%। ২০২৩ সালে ভারতের রুশ তেল আমদানি দ্বিগুণ হয় এবং রপ্তানি করে রেকর্ড মুনাফা অর্জন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শুল্ক আরোপ মূলত ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাকে প্রভাবিত করতে চাওয়া।
যুক্তরাষ্ট্র চায়, ভারত:
- অটোমোবাইল ও ইভি পণ্য
- কৃষিপণ্য ও দুগ্ধজাত দ্রব্য
- জিএম ফসল ও ওয়াইন
- পেট্রোকেমিক্যাল ইত্যাদির ওপর শুল্ক কমাক, ভারত এসব বিষয়ে আপস করতে রাজি নয়। দুই দেশ এখন অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে চুক্তির প্রথম ধাপ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
এমন সময়ে ভারতকে শাস্তি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যখন তারাই রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম ও সার কিনছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে ট্রাম্প স্পষ্ট কিছু বলেননি। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত নীতিই মার্কিন নীতির জটিলতা তুলে ধরে।
এক সময় উষ্ণ সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে মোদি ও ট্রাম্পের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোদি এখন ট্রাম্পের ধৈর্য হারানোর ঝুঁকির মুখে। ট্রাম্পের দাবি, “মোদি নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে চাইছেন, কিন্তু এখন তাঁকে একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে।”
ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন, মোদি যুক্তরাষ্ট্রে আদানি গ্রুপের দুর্নীতির তদন্তে জড়িত থাকতে পারেন—এজন্য তিনি ট্রাম্পের সামনে কিছু বলতে পারছেন না। তার দাবি, আদানি-রাশিয়া-মোদি তেলের লেনদেনের আর্থিক সম্পর্ক ফাঁস হয়ে যেতে পারে।
অজয় সহাই, ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনস–এর ডিজি বলেন, “এটি ভারতের ৫৫% রপ্তানির ওপর প্রভাব ফেলবে।” এ প্রসন্ন, আইসিআইসিআই সিকিউরিটিজের প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, “৫০% শুল্ক ভারতের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা।” এইচডিএফসি ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ সাক্ষী গুপ্তা সতর্ক করে বলেন, “যদি শুল্ক কার্যকর হয়, তাহলে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬%–এর নিচে নেমে আসবে।”

