দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি অপরিহার্য ভিত্তি। শিল্পখাত, কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতের সুষ্ঠু কার্যক্রম নির্ভর করে জ্বালানি সরবরাহের নিরবচ্ছিন্নতা ও স্থিতিশীলতার ওপর। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা অতীব জরুরি।
জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি। এ জন্য সরকারের উচিত জ্বালানি খাতে দক্ষতা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা। বর্তমান সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গত এক বছরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মাধ্যমে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
নীতিগত সংস্কার: সাশ্রয় ও স্বচ্ছতার নতুন দিগন্ত:
২০২৪ সালে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন, ২০১০’ বাতিল করে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮’ অনুসরণ করা শুরু হয়। এর ফলে সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ফিরে এসেছে এবং তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি আমদানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে ২৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৪৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করে ৩০২.৭ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে।
এছাড়া পেট্রোবাংলা ও ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেডের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৭টি এলএনজি কার্গো সাশ্রয়ী মূল্যে আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যার আনুমানিক সাশ্রয় ৩০৮.১৩ কোটি টাকা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দরপত্র ও সরকার-থেকে-সরকার আলোচনার মাধ্যমে জ্বালানি তেল আমদানিতে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭,০৫৪ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এই নীতিগত পরিবর্তনগুলি সরকারকে জ্বালানি খাতে অপচয় রোধ এবং অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম করেছে। এসব পদক্ষেপ প্রমাণ করে, সঠিক নিয়ম ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।
অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত:
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সিস্টেম লস কমানোর জন্য বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান কাফকো এবং লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন গ্যাস বিক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে বার্ষিক অতিরিক্ত রাজস্ব যথাক্রমে ৬৪০.৭১ কোটি ও ৪৬৩.২৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাবে। এই রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সরকারকে আর্থিকভাবে আরও স্থিতিশীল করে তুলবে।
এছাড়া, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস কমানোর জন্য একটি বিস্তারিত রোডম্যাপ তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিস্টেম লস হ্রাস থেকে সরকার প্রায় ২১৮.৯৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করবে। এটি দেখায়, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির মাধ্যমে অপচয় রোধ করে অর্থ উপার্জন বাড়ানো যায়।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশন শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুত খাতের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করেছে, যা থেকে বছরে ৯৮.২২ কোটি টাকা রাজস্ব বৃদ্ধি হবে। এই ধরনের পদক্ষেপ জ্বালানি খাতের আর্থিক স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা: গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্য:
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন ৩টি রিগ ক্রয় এবং ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৯টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার শেষ করে দৈনিক ৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে বছরে প্রায় ১,৯৪৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এটি শুধু আর্থিক সাশ্রয় নয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও বড় অবদান। অন্যান্য প্রকল্পেও কঠোর ব্যয়ের নজরদারি ও সাশ্রয় নিশ্চিত হয়েছে। যেমন:
- সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্পে ১৯৩.২৯ কোটি টাকা সাশ্রয়,
- চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পরিবহন প্রকল্পে ৪৫.১১ কোটি টাকা সাশ্রয়,
- বাখরাবাদ-মেঘনাঘাট-হরিপুর গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণে ৩১.০৪ কোটি টাকা সাশ্রয়।
এছাড়া, গ্যাস স্টেশন স্থাপন, ফ্লো মিটার স্থাপন এবং অন্যান্য পাইপলাইন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ৯২.৪৭ কোটি টাকা সাশ্রয় করা হয়েছে। এসব উদ্ভাবনী উদ্যোগ সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা: বিশ্বব্যাংকের গ্যারান্টি ফ্যাসিলিটি:
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা গ্রহণে সফল হয়েছে। বিশ্বব্যাংক থেকে ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের গ্যারান্টি ফ্যাসিলিটি অনুমোদন পেয়ে সরকার ভবিষ্যতে আমদানির জন্য ঝুঁকি কমাতে সক্ষম হবে। এই সুবিধা নভেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর হবে।
এই ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে আগামী ৭ বছরে সরকারি কোষাগারে প্রায় ২,৭৭২ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। পরবর্তীতে এই পরিমাণ ৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে দেশ দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল জ্বালানি আমদানি অর্থায়ন পাবে। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও মজবুত করবে।
দৃষ্টান্ত স্থাপন ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ:
গত এক বছরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ শুধুমাত্র নিয়মিত কাজ করেনি, বরং বিচক্ষণ নীতিগত সংস্কার, কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা ও পরিকল্পিত কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সরকারের নেতৃত্বে বিশেষ বিধান বাতিল করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সিস্টেম লস কমানো এবং রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্যোগগুলি সফলতার মাপকাঠি হিসেবে কাজ করছে।
এছাড়া, আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণ করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। এই সাফল্য শুধু কিছু পরিসংখ্যান নয়, দেশের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে, এই সফলতা ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতে আরও মজবুত করতে সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে, যা জনগণের জীবনে সুদৃঢ় প্রভাব ফেলবে।

