অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেছে। অর্থনীতির নানা সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি, তবে কিছুটা স্থিতিশীলতার উন্নতি হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বিপর্যস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে এখনও বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে, বিশেষ করে শিল্প খাতে।”
শিল্প খাত এখনো সংকটে ভুগছে। ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। চালু থাকা কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকে নেমেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারে ও রপ্তানিতে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যাওয়ায় কিছু কারখানা হামলা ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। এর ফলে প্রায় এক লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা উন্নতি হলেও গ্যাস সরবরাহের অসমতা রয়ে গেছে। মালিকদের অভিযোগ, এক এলাকায় গ্যাস বাড়লেও অন্যত্র কমে যায়। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা বজায় রাখা কঠিন হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ৩-৪ ঘণ্টা কিংবা দিনে ৮-১০ ঘণ্টা গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে তৈরি পোশাক, প্লাস্টিক, সিরামিক ও স্টিল খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রপ্তানিকারকরা আগের অর্ডার হারাচ্ছেন, নতুন অর্ডার নিতে পারছেন না।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঋণের সুদহার লাফিয়ে ১৫ শতাংশে উঠায় শিল্পোদ্যোক্তারা দ্বৈত চাপে পড়েছেন। ঋণ শোধে সমস্যা ও উচ্চ সুদের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট রেটিং কমে গেছে, ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে গেছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “আইনশৃঙ্খলায় কিছু উন্নতি হলেও জ্বালানি সংকট এখনো প্রবল। প্রতিনিয়ত ভোগান্তি সইতে হচ্ছে।” ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, “গ্যাস, ঋণের উচ্চ সুদ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।”
শিল্প খাতে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে বিপর্যয়:
সম্প্রতি গুলশানে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ আয়োজিত ‘দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট সমাধানের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে শিল্পী ও ব্যবসায়ীরা সমস্যার বর্ণনা দিয়েছেন। বক্তারা জানান, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে কয়েকশ কারখানা বন্ধ হয়েছে, রপ্তানি আয় কমেছে, বিনিয়োগ থমকে গেছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে না। তাঁরা বলেন, শিল্প খাত না বাঁচালে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থেমে যাবে। দ্রুত গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে হবে।
- বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “পোশাক খাতে ৩০-৩৫ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। স্টিল কারখানায় ২৫-৩০ শতাংশ। সিরামিকে অর্ধেক কম। ডিজেল ব্যবহার ও শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের কারণে খরচ বেড়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পের ৪০ শতাংশ বন্ধ হওয়ার পথে।”
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, “সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিচ্ছে। গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে দুর্নীতির কারণে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয়েছে। আমরা তা বদলাতে চাই।”
- বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশিরউদ্দীন অভিযোগ করেন, অতীতে গ্যাসের জন্য ঘুষ দিতে হয়েছে। এখন সৎ উদ্যোক্তারা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে শিল্পে গ্যাস সংকট খুব বড় সমস্যা।
শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট ও কারখানার বন্ধ:
হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ.কে. আজাদ বলেন, “গ্যাস না পেয়ে কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে। শ্রমিকরা চাকরি চাইছে, কিন্তু কারখানা চালানো যাচ্ছে না।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কটন সামিট থেকে ফিরে বলেন, “আমাদের পণ্যের দাম বাড়াতে পারছি না, কারণ প্রতিদ্বন্দ্বীরা কম দামে পণ্য দিচ্ছে।”
বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, “প্রতিবছর প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মী চাকরির বাজারে আসছে। শিল্পায়ন ছাড়া তাদের কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। এর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস প্রয়োজন।”
বিসিআইর সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী জানান, “শিল্প প্রবৃদ্ধি কমছে। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা আগের বছরের ১০ দশমিক ২৯ থেকে কমেছে। গত কয়েক মাসে ২০০ কারখানা বন্ধ ও ৩০০ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।”

পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা ও গ্যাস উৎপাদনের বর্তমান বাস্তবতা:
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, “শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। ভোলা থেকে গ্যাস আনার টেন্ডার ও অফশোর বিডিং শিগগির হবে। নতুন গ্যাস উৎস অনুসন্ধানে কাজ চলছে।”
তবে পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত কারণে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ৩০০ কোটি ঘনফুটের বেশি সম্ভব নয়। দেশের দৈনিক গ্যাস চাহিদা ৪১০ থেকে ৪২০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো। অবৈধ সংযোগ ও সিস্টেম লস প্রায় ২০ শতাংশ হওয়ায় সমস্যা বাড়ছে। নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।
টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে গ্যাস সংকট:
রপ্তানি আয় বৃদ্ধির শীর্ষ খাত তৈরি পোশাকের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন। গ্যাসের দাম বাড়লেও কারখানাগুলো উৎপাদন চালাতে পারছে না। এতে পণ্য ডেলিভারি দেরি হচ্ছে, ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। বস্ত্র খাতের চার সংগঠন গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তারা বলছে, গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ কারখানা বন্ধের কারণ। গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার না পেয়ে রপ্তানি আয়ের বড় ক্ষতি হচ্ছে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “সরকারের সঙ্গে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বহুবার গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে, কিন্তু সুরাহা হয়নি।” বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফারুক হাসান নতুন কূপ খনন ও এলএনজি আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা জানিয়েছেন। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দেশে দৈনিক গ্যাস চাহিদা প্রায় ৪২০০ মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ মাত্র ২৬৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সম্প্রতি শিল্প খাতের গ্যাসের দাম বাড়ানোর গণশুনানি করেছে। বর্তমানে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা হলেও নতুন প্রস্তাবে এটি বাড়িয়ে ৭৫ টাকা ৭২ পয়সা করা হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীরা বিরোধ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো শিল্পের জন্য ধাক্কা। গ্যাসের সরবরাহ অপ্রতুল, তাই দাম বাড়ানো যুক্তিযুক্ত নয়।

অর্থনীতি, শিল্প ও কর্মসংস্থানে প্রভাব:
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প কারখানার উৎপাদন কমায় রপ্তানি আয় প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার কমেছে। বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমেছে। শিল্প খাতে ঋণের এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে ৪১ শতাংশ। শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে হচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু বিদেশি ক্রেতারা দাম বাড়াচ্ছে না। পাকিস্তান ও ভারতের ভর্তুকি নীতির কারণে তারা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে। ফলে বাংলাদেশের শিল্প খাত সংকটে পড়ে যাচ্ছে। শিল্প বন্ধ হওয়ায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি থেমে গেছে, নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। কৃষি থেকে বেকার শ্রমিক যোগ হওয়ায় সমস্যা আরও বাড়ছে।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ার পথে থাকলেও শিল্প খাতের সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিশ্র সমস্যার কারণ। সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে—নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, স্বচ্ছ ব্যবসায়িক পরিবেশ গঠন—যার সুফল আসবে ভবিষ্যতে। কিন্তু এখনো বাস্তব সমস্যা কাটানো প্রয়োজন।
শিল্প খাত বাঁচাতে এবং অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে দ্রুত গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ঋণের সুদ কমানো ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা জরুরি। শ্রমিকদের চাকরি রক্ষা ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও সময়ের দাবি। অন্যথায় রপ্তানি আয়ের বড় ধাক্কা এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা বাড়বে।

