যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আবারও শুল্কবিরতির মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। গতকাল সোমবার তারা আরও ৯০ দিন সময় বাড়িয়েছে। ফলে পারস্পরিক পণ্যে তিন অঙ্কের শুল্ক আরোপ আপাতত বন্ধ থাকবে। এ সিদ্ধান্তে মার্কিন ক্রেতারা স্বস্তিতে আছেন। বছরের শেষের বড়দিন উৎসব সামনে রয়েছে। সেই সময় সাধারণত ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতারা এখন মজুত বাড়ানোর প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানিয়েছেন, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে চীনের পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপ ১০ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। ট্রাম্প বর্তমানে বিশ্বের নানা দেশের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ করছেন। এর সূত্রপাত চীনের সঙ্গে। ২০১৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পরই তিনি চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন। দেখা যাক, চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের প্রধান ঘটনা ও তারিখগুলো:
২১ জানুয়ারি: দায়িত্ব নেওয়ার পর একদিনেই ট্রাম্প চীন থেকে আমদানি করা পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। অভিযোগ করেন, চীন থেকে ফেন্টানিল যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে।
১ ফেব্রুয়ারি: চীনা পণ্যে ১০ শতাংশ এবং মেক্সিকো ও কানাডার পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। দাবি করেন, এসব দেশ থেকে ফেন্টানিল ও অবৈধ অভিবাসন প্রবাহ কমাতে হবে।
৪ ফেব্রুয়ারি: চীন পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। মার্কিন কোম্পানি যেমন গুগল, কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারক ও ফ্যাশন ব্র্যান্ড ক্যালভিন ক্লেইনকে টার্গেট করে নানা পদক্ষেপ নেয়। একই সঙ্গে মার্কিন কয়লা ও এলএনজি আমদানিতে ১৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেল ও গাড়ি আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এসব শুল্ক ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। চীন প্রতিরক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অন্যান্য শিল্পে ব্যবহৃত পাঁচটি ধাতুর রপ্তানি সীমিত করে।
৩ মার্চ: যুক্তরাষ্ট্র সব চীনা আমদানিতে ফেন্টানিল-সম্পর্কিত শুল্ক দ্বিগুণ করে ২০ শতাংশে, যা ৪ মার্চ থেকে কার্যকর হয়।
৪ মার্চ: চীন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি রপ্তানিতে পাল্টা ১০-১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। প্রায় ২১ বিলিয়ন বা ২১০০ কোটি ডলারের মার্কিন পণ্যে প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে ২৫টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর রপ্তানি ও বিনিয়োগ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। চিকিৎসাযন্ত্র প্রস্তুতকারী ইলুমিনার জেনেটিক সিকোয়েন্সার আমদানিও নিষিদ্ধ করে।
২ এপ্রিল: যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের ৫৭টি দেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। বাকি দেশগুলোর ওপর ১০ শতাংশ ভিত্তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। ট্রাম্প এই দিনটিকে ‘স্বাধীনতা দিবস’ ঘোষণা করেন। তিনি সব আমদানিতে ১০ শতাংশ এবং চীনা পণ্যে ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এই শুল্ক ৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়। ২ মে চীন ও হংকং থেকে কম মূল্যের চালানে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার (ডি মিনিমিস ছাড়) বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
৪ এপ্রিল: চীন সব মার্কিন পণ্যে ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে (১০ এপ্রিল থেকে কার্যকর), কিছু বিরল ধাতুর রপ্তানি সীমিত করে। প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত ৩০টি মার্কিন সংস্থার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। কিছু মার্কিন কোম্পানির সরগম, পোল্ট্রি ও বোনমিল আমদানিও স্থগিত করে।
৮ এপ্রিল: যুক্তরাষ্ট্র সব চীনা পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে ৮৪ শতাংশে উন্নীত করে।
৯ এপ্রিল: চীন মার্কিন পণ্যে শুল্ক ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। ১২টি মার্কিন কোম্পানিকে ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ তালিকায় এবং আরও ছয়টি কোম্পানিকে অবিশ্বস্ত কোম্পানির তালিকায় যুক্ত করে। পরে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যে শুল্ক ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়। চীন নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে সতর্কতা জারি করে।
১০ এপ্রিল: চীন হলিউড চলচ্চিত্র আমদানিতে তাৎক্ষণিক সীমাবদ্ধতা দেয়।
১১ এপ্রিল: চীন মার্কিন পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে ১২৫ শতাংশে উন্নীত করে এবং ট্রাম্পের শুল্ককৌশলকে ‘কৌতুক’ বলে অভিহিত করে।
১৫ এপ্রিল: মার্কিন চিপ কোম্পানি এনভিডিয়া জানায়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের এইচ২০ চিপ চীনে বিক্রির জন্য রপ্তানি লাইসেন্স নিতে বলেছে।
১০-১২ মে: জেনেভায় দুই দেশের মধ্যে উচ্চ ঝুঁকির বাণিজ্য আলোচনায় ৯০ দিনের জন্য শুল্কবিরতি চুক্তি হয়। যুক্তরাষ্ট্র চীনের পণ্যে শুল্ক ১৪৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে নামায়। চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে শুল্ক ১২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নিয়ে আসে। চীন জানায়, ২ এপ্রিলের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপিত অশুল্ক বাধাও তুলে নেবে।
২৮-২৯ মে: যুক্তরাষ্ট্র জানায়, চীনা শিক্ষার্থীদের ভিসা ‘আগ্রাসীভাবে’ বাতিল করা হবে। চীনে সেমিকন্ডাক্টর, ডিজাইন সফটওয়্যার ও বিমানের যন্ত্রাংশ পাঠানো বন্ধের নির্দেশ দেয়।
৩১ মে: ট্রাম্প অভিযোগ করেন, চীন জেনেভা চুক্তি ভঙ্গ করেছে। চীন পাল্টা অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে একাধিক ‘বৈষম্যমূলক’ ব্যবস্থা নিয়েছে।
৫ জুন: প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও ট্রাম্প এক ঘণ্টার ফোনালাপ করেন।
৯-১০ জুন: লন্ডনে দুই দেশের মধ্যে নতুন বাণিজ্য আলোচনা হয় এবং প্রাথমিক কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছানো হয়।
১১-১২ জুন: চীনের কিছু বিরল ধাতু ও চুম্বক উৎপাদক রপ্তানি লাইসেন্স পেতে শুরু করে। ট্রাম্প বলেন, বাণিজ্য বিরতি সঠিক পথে ফিরেছে।
২৭ জুন: যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, বিরল ধাতু ও চুম্বক রপ্তানির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মতপার্থক্য মিটেছে।
৬ জুলাই: ব্রিকসের যেসব দেশ মার্কিন বিরোধী নীতি গ্রহণ করেছে, তাদের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন ট্রাম্প। চীনও এর মধ্যে রয়েছে।
১৫ জুলাই: যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সচিব স্কট বেসেন্ট জানান, এনভিডিয়ার এইচ২০ চিপ চীনে বিক্রির পরিকল্পনা বিরল ধাতুবিষয়ক সমঝোতার অংশ। এজন্য রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
২৮-২৯ জুলাই: স্টকহোমে দুই দিনের আলোচনার পর দুই দেশ ৯০ দিনের শুল্কবিরতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বড় কোনো অগ্রগতি না হলেও আলোচনাকে ‘গঠনমূলক’ বলা হয়।
১ আগস্ট: বেসেন্ট জানান, চীনের সঙ্গে চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আশাবাদী।
৮ আগস্ট: যুক্তরাষ্ট্র এনভিডিয়াকে এইচ২০ চিপ চীনে রপ্তানির লাইসেন্স দেয়।
১০ আগস্ট: ট্রাম্প চীনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানি চারগুণ করার আহ্বান জানান। এটি ১২ আগস্ট শুল্কবিরতি শেষ হওয়ার ঠিক আগে আসে।
১১ আগস্ট: যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আরও ৯০ দিনের জন্য শুল্কবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়।
এই একাধিক ধাপে প্রণীত শুল্কবিরতি এবং আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে মিত্রতার পথে পুরোপুরি পৌঁছাতে এখনও সময় এবং সহযোগিতা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট, বাণিজ্যসহ নানা বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করার জন্য সংলাপ ও সমঝোতা একান্ত জরুরি। আগামী দিনে এসব প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা সুফল পাবেন।

