গত অর্থবছরে আমদানির তুলনায় রফতানি খাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবু বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি। একই সময়ে দেশের সার্ভিস খাতের ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে সেবা খাতের ঘাটতি বাড়ছে। এ দুই কারণে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টে (বিওপি) চাপ পড়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ ব্যালান্স অব পেমেন্টের তথ্য গতকাল প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০.৩৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে সার্ভিস খাতে ঘাটতি ছিল ৫.৪১ বিলিয়ন ডলার। তবে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এ ঘাটতি কিছুটা পূরণ করেছে। গত অর্থবছরে প্রবাসীরা ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান। এটি রেকর্ড রেমিট্যান্স হিসেবে দেশের বিওপিতে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে। চার বছর পর গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক উদ্বৃত্তের ধারায় ফিরেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ছিল ১৫ কোটি ডলার। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে উদ্বৃত্ত ছিল ৩.৯৮ বিলিয়ন ডলার। এ দুই হিসাব ইতিবাচক থাকায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিওপিতে ৩.৩৯ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের পর তিন বছর বিওপিতে বড় ঘাটতি হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৬.৬৬ বিলিয়ন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮.২২ বিলিয়ন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪.৩০ বিলিয়ন ডলার। তিন বছরে মোট ঘাটতি ছিল ১৯.১৮ বিলিয়ন ডলার। ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরবর্তী তিন বছরে অর্ধেক কমে আসে।
বিওপি উদ্বৃত্তে ফিরে আসায় অর্থনীতিতে স্বস্তি এসেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, “গত তিন বছরের ডলারের সংকট শেষ। ব্যবসায়ীরা স্বাচ্ছন্দ্যে আমদানির এলসি খুলতে পারছেন। বাজারে চাহিদার চেয়ে ডলারের জোগান বেশি। এ কারণে চলতি অর্থবছরের দেড় মাসের মধ্যে বাজার থেকে ৬৪ কোটি ডলার কেনা হয়েছে।”
ব্যালান্স অব পেমেন্ট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের আমদানি ব্যয় ১.৮ শতাংশ বেড়েছে। দেশের পণ্য আমদানি হয়েছে ৬৪.৩৫ বিলিয়ন ডলার। রফতানি হয়েছে ৪৩.৯৬ বিলিয়ন ডলার। রফতানিতে বেড়েছে ৭.৭ শতাংশ। তবে আমদানি বাদে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ২০.৩৯ বিলিয়ন ডলার।
দেশের রফতানি খাত মূলত তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। তবু সেবা রফতানি তেমন বাড়েনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেবা রফতানি থেকে আয়ের পরিমাণ ছিল ৬.৭৩ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে সেবা খাতে ব্যয় হয়েছে ১২.১৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে সেবা খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫.৪১ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৪.২৪, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪.২৬ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩.৯৫ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে গত অর্থবছরে সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সেবা খাতের ঘাটতি আগামীতে আরও বাড়বে। কারণ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণরা পিছিয়ে। প্রযুক্তি সেবা বেশির ভাগই আমদানি করতে হয়। সমুদ্রগামী জাহাজ ও বিদেশ যাত্রার জন্য পর্যাপ্ত উড়োজাহাজও নেই।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “সেবা খাতে আয়ের সুযোগ আছে। কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না। দেশের ৫০ শতাংশ জনসংখ্যা ২৬ বছরের নিচে। এ জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তর করতে পারিনি। উচ্চশিক্ষার মানও খারাপ। তরুণরা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যোগ্য নয়। এ কারণে সেবা খাতে অবস্থান উন্নত করার সুযোগ হারাচ্ছি।”
তিনি আরো বলেন, “তরুণদের কিছু অংশ আউটসোর্সিং থেকে আয় করছে। তবে প্রতিবেশী ভারত তুলনায় অনেক এগিয়ে। আমাদের আয়ের বেশির ভাগই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে আসে। বিদেশী বিনিয়োগের বড় অংশও বিদ্যমান কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগ।”

