শিল্প খাতের মন্দা এখনও কাটেনি। গত কয়েক বছরের মতো, ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও শিল্পের বিকাশের প্রধান উপকরণ— যন্ত্রপাতি-আমদানি কমেছে। একই সঙ্গে এলসি খোলার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর প্রভাব আগামী কয়েক মাসে আরও দেখা যাবে। শিল্পের সহযোগী অন্যান্য খাতের যন্ত্রপাতি আমদানি এবং এলসি খোলাও কমেছে।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বৃদ্ধি হয়েছে, তবে মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পে। রপ্তানি নয় এমন শিল্পে কাঁচামাল আমদানি কমেছে। একই সঙ্গে মধ্যবর্তী কাঁচামালের আমদানি ও এলসি খোলাও কম। এসব কারণে মোট উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি কমেছে। তবে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তথ্য পাওয়া গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
সূত্র জানায়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর ২০২০ সালের মার্চ থেকে শিল্প খাতে মন্দা প্রকট হতে থাকে। তার আগেও কিছুটা মন্দার ছাপ ছিল। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বৈশ্বিক মন্দা শুরু হয়। ডলার সংকটের কারণে মন্দা আরও গভীর হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে অস্থিরতা দেখা দেয়, যা মন্দাকে তীব্রতর করেছে। এভাবে শিল্প খাতে প্রায় সোয়া পাঁচ বছর ধরে মন্দা বিরাজ করছে।
মন্দার বড় একটি কারণ হলো বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ হ্রাস। রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট এবং ঋণের সুদের হার বৃদ্ধিও প্রভাব ফেলেছে। চলতি অর্থবছর সুদের হার ১২ থেকে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে শিল্প খাতের ঋণের প্রাপ্যতা কমেছে এবং উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুসারে, মৌলিক শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২৫.৪২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে এলসি খোলা কমেছে ২৫.৪১ শতাংশ। যন্ত্রপাতি আমদানির সঙ্গে এলসি কমার প্রভাব আগামী মাসেও চলবে, কারণ পণ্য দেশের পৌঁছাতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে।
বিবিধ শিল্পের সহায়ক যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১.৮৮ শতাংশ, এলসি খোলা কমেছে ০.৫১ শতাংশ। মোট যন্ত্রপাতির ৬০ শতাংশই গার্মেন্ট, বস্ত্র ও ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত। গার্মেন্ট শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে ১২.৪১ শতাংশ, এলসি খোলা বেড়েছে ৩.৮১ শতাংশ। বস্ত্রখাতের আমদানি কমেছে ২৫.৬৮ শতাংশ, এলসি খোলা কমেছে ২৪.৮৮ শতাংশ। ওষুধশিল্পের আমদানি কমেছে ৩৫.২৭ শতাংশ, এলসি খোলা কমেছে ১.৮৮ শতাংশ। চামড়াশিল্পের আমদানি বেড়েছে ৮.৫৬ শতাংশ, এলসি কমেছে ৪৩.৮৫ শতাংশ। পাটশিল্পের আমদানি বেড়েছে ১১.৫ শতাংশ, এলসি কমেছে ৮.৮০ শতাংশ। প্যাকিং শিল্পের আমদানি বেড়েছে ৩৫.২৩ শতাংশ, এলসি কমেছে ২৯.২৫ শতাংশ। অন্যান্য শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি ৩২.১৯ শতাংশ, এলসি খোলা কমেছে ৩১.৬৯ শতাংশ।
ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের আমদানি ৪১.৪২ শতাংশ কমেছে, এলসি খোলা কমেছে ৩৬.৬৮ শতাংশ। কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে ২৫.২৭ শতাংশ, এলসি খোলা কমেছে ২৭.০১ শতাংশ।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানি মোট ৮.৩৭ শতাংশ বেড়েছে, তবে এলসি খোলা কমেছে ০.১৫ শতাংশ। রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ১৮.৬২ শতাংশ বৃদ্ধি, এলসি খোলা বেড়েছে ৭.২৪ শতাংশ। এর ফলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৮.৬০ শতাংশ। তবে জুনে রপ্তানি আয়ে ১০.৫৬ শতাংশ হ্রাস দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ২৫ শতাংশ।
মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৮.৮৫ শতাংশ, এলসি খোলা কমেছে ৬.২৬ শতাংশ। সিমেন্ট, রিরোলিং মিল, আয়রন ও স্টিল স্ক্র্যাপসহ বিভিন্ন শিল্পে মধ্যবর্তী কাঁচামালের আমদানি কমেছে। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমার কারণে শিল্পে ঋণের জোগানও সীমিত।
সার্বিকভাবে, যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানি কম হওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধি ধীরগতিতে চলছে। তবে রপ্তানির বৃদ্ধি শিল্প খাতের একমাত্র ইতিবাচক দিক।

