নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভর করে দেশের সব মানুষকে ব্যাংকিং সেবায় আনা সম্ভব নয়। বরং মোবাইলভিত্তিক ডিজিটাল আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল পরিচয়ভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তুললে বাংলাদেশ দ্রুত নগদ-নির্ভরতা কমিয়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বড় অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ব্যাংকার্স মিট ২০২৫-এ এসব কথা বলেন বিশ্বখ্যাত ফিনটেক বিশেষজ্ঞ ও ভবিষ্যৎবিদ ব্রেট কিং। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধও উপস্থাপন করেন তিনি। ব্রেট কিং বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতের উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ (এনপিএল) এবং প্রশাসনিক সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ফিলপস লিমিটেড, সহযোগিতা করেছে সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও এবি ব্যাংক। ব্যাংকার্স মিটে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেতারা এবং জ্যেষ্ঠ নির্বাহীরা অংশ নেন। আলোচনা হয় ভবিষ্যৎমুখী ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে। প্রশ্নোত্তর পর্বে ব্রেট কিং বলেন, চীন ২০১২ সালে বাংলাদেশের মতোই নগদ-নির্ভর অর্থনীতির দেশ ছিল। এখন সেখানে খুচরা লেনদেনে নগদ ব্যবহার ১ শতাংশের কম। বাংলাদেশও চাইলে একই পরিবর্তন ১০-১২ বছরের মধ্যে সম্ভব। তবে এজন্য প্রয়োজন ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কের মানোন্নয়ন, কম দামে স্মার্টফোনের প্রাপ্যতা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ।
তিনি বলেন, কেবল নগদ লেনদেন করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নগদ দিয়ে ডেটা সেন্টারের সার্ভারের সময় কেনা যায় না, ড্রোন ওড়ানো বা স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক যান চালানোও সম্ভব নয়। ডিজিটাল রূপান্তরের কৌশল নিয়ে প্রশ্নে ব্রেট কিং বলেন, বড় ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিতে রূপান্তরিত হতে হবে, অথবা আলাদা ডিজিটাল ব্যাংক চালু করে ধীরে ধীরে গ্রাহক স্থানান্তর করতে হবে। তিনি উদাহরণ দেন সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক, যেখানে বোর্ড থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মী পর্যন্ত উদ্ভাবনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সফলভাবে ডিজিটাল রূপান্তর ঘটেছে।
ব্যাংকিং খাতে প্রতারণা রোধে প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে ৮০ শতাংশ জালিয়াতি সামাজিক প্রকৌশল বা পুরোনো প্রমাণীকরণ পদ্ধতির দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হয়। স্বাক্ষর (সিগনেচার) ১০০ বছর ধরে নিরাপদ মনে করা হয় না। তার মতে, বায়োমেট্রিক প্রমাণীকরণ ও উন্নত এআইভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তকরণ প্রযুক্তিই ভবিষ্যতের সমাধান।
ব্রেট কিং ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব প্রধান আর্থিক অবকাঠামো প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাবে। যারা সময়মতো ডিজিটাল রূপান্তরে ব্যর্থ হবে, তাদের অনেক ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে না। ২০৫০ সালের মধ্যে ‘ব্যাংক’ ধারণা ১৯৯০ বা ২০০০ দশকের ব্যাংকের সঙ্গে মিলবে না। সবই হবে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা কাঠামোর প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা (সিবিডিসি) কেন জনপ্রিয় হচ্ছে না, এমন প্রশ্নে ব্রেট কিং বলেন, খুচরা লেনদেনে সিবিডিসির সাফল্য কম। তবে আন্তসীমান্ত বাণিজ্যে এটি কার্যকর হতে পারে। বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বা আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে লেনদেনে সিবিডিসির ব্যবহার বাড়াতে পারে। সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন বলেন, বর্তমানে দেশের জনপ্রিয় ব্যাংকিং অ্যাপের সংখ্যা হাতে গোনা। যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত করতে যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, কয়েকটি ব্যাংক ডিজিটালভাবে এগিয়ে থাকলেই চলবে না। সবাইকে একসঙ্গে এগোতে হবে। ব্যাংকিং খাতে আন্তসংযোগ এখন শুধু ট্রেজারি বা পেমেন্ট খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এপিআই শেয়ারিংও বাস্তবতা। সমানভাবে ডিজিটালি অগ্রসর হলে পুরো শিল্পের জন্য লাভজনক হবে।
ফিলপসের বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার তুষার হাসান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করা এবং তাদের কৌশলগত লক্ষ্যের সঙ্গে আমাদের সমাধানকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।” সমাপনী বক্তব্যে ফিলপসের সিইও বিশ্বাস ধাকাল বলেন, ফিলপস উদীয়মান বাজারে বছরের পর বছর অর্জিত প্রযুক্তি ও পরিচালন দক্ষতা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। তারা দীর্ঘমেয়াদে এখানে থাকতে চান। ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও শিল্পের অংশীদারদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে ডিজিটাল রূপান্তর এগিয়ে নেবেন।
অনুষ্ঠানে সিটি ব্যাংক ও এবি ব্যাংকের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্বের ঘোষণা দেন ফিলপস। সিটি ব্যাংকের জন্য তাদের ফ্ল্যাগশিপ সিটি টাচ ডিজিটাল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম পুনর্গঠন করা হবে। এতে আরও স্মার্ট ও নিরবচ্ছিন্ন গ্রাহক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে, এবি ব্যাংকের অংশীদারত্বের মাধ্যমে চালু হবে ডিজিটাল ন্যানো লোন সুবিধা।

