পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) ও নরিনকো পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই কেন্দ্র দেশীয় মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৭,৫০০ মেগাওয়াটে নিয়ে গেছে।
তবে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা এখনও ১৬,৪০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। ফলে পিক আওয়ারেও অন্তত ১০,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না নেওয়ার পরেও সরকারকে দিতে হচ্ছে বাড়তি ক্যাপাসিটি চার্জ। নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে গ্যাসভিত্তিক প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু দেশে গ্যাস সংকটের কারণে সেগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। খুলনার রূপসা কেন্দ্রেও একই সমস্যা। দেশে দৈনিক চাহিদার তুলনায় অন্তত এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি রয়েছে। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হচ্ছে ব্যয়বহুল এলএনজি।
বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকার বিপুল দায়-দেনা করেছে। দরপত্র ছাড়াই এককভাবে কেন্দ্র নির্মাণ ও এলএনজি আমদানি করে কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু গত এক বছরে আইনগত কিছু সংস্কার এবং বকেয়া পরিশোধ ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি হয়নি। ভর্তুকি, ক্যাপাসিটি চার্জ ও গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ না নিলে খাতটি পরবর্তী সরকারের জন্য বড় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের বকেয়া প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পেট্রোবাংলার গ্যাস খাতে ২৭ হাজার কোটি এবং বিপিডিবির বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকার এক বছরে তা পরিশোধ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বকেয়া পরিশোধের চেয়ে খাতের ভর্তুকি কমানো এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা জরুরি ছিল। তবে গত অর্থবছরে ভর্তুকি হয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। গ্যাস খাতে বিশেষ করে এলএনজিতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৮,৯০০ কোটি টাকা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, ‘খাতের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়-সাশ্রয় নিশ্চিত করতে আলাদা সংস্কার কমিটি থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের শ্বেতপত্রে ব্যয় সংকোচন ও দুর্নীতির বিষয় যথাযথভাবে উঠে আসেনি। ফলে ভোক্তাদের খরচ কমানো যায়নি।’ অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের কারণে বিগত সরকার খাতটিতে বড় আর্থিক ক্ষতি করেছে। ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। ২০১০-১১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত শুধু ভর্তুকিতে খরচ হয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা।
স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের কারণে দেশকে এলএনজি আমদানি করতে হয়েছে। গত দুই দশকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকা। আমদানি কমিয়ে স্থানীয় গ্যাস কূপ খননের বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও দক্ষ জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা পুরনো নিয়মেই চলছে। ফলে সরকারের ওপর এখনো বড় ভর্তুকি চাপ আছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে টেকসই সমাধান না হলে পরবর্তী সরকারের জন্য আর্থিক বোঝা বড় হবে। সরকার জানাচ্ছে, মৌলিক সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে। বিতর্কিত ২০১০ সালের বিশেষ আইন বাতিল করা হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী সম্পাদিত চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ হয়নি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, সংস্কার মানে শুধু চুক্তি বাস্তবায়ন নয়। দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ বৃদ্ধির নিশ্চয়তা এবং আর্থিক সক্ষমতা বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা জরুরি। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার দরকার। বিনিয়োগকারীদের নিশ্চয়তা ও পেমেন্ট সিকিউরিটি মেকানিজম নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগ টানা জরুরি। আগামী সরকারের জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন।’
বিএনপির সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ছিল সবচেয়ে বড় দুর্নীতির খাত। চুক্তি প্রকাশ করতে না পারায়, পরবর্তী সরকার এখনও বড় চাপের মুখে। বকেয়া পরিশোধকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতি কমেনি।’
অন্তর্বর্তী সরকার এক বছরে ভর্তুকি কমিয়ে ৬২ হাজার কোটি থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নামিয়েছে। বিপিডিবির ১০ শতাংশ ব্যয় হ্রাস, এলএনজি সার্ভিস চার্জ কমানো, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ট্যারিফ কমানো, ১০টি পুরনো কেন্দ্র বন্ধ—সব মিলিয়ে দেড় হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় হয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির ট্যারিফ হ্রাসে ২,৬৩০ কোটি টাকার সাশ্রয় হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ আইন বাতিলের পর আর এককভাবে কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই। গ্যাস সংকট সমাধান হওয়া প্রয়োজন। ট্যারিফ কাঠামো ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে যাতে পরবর্তী সরকার সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে।’

