সততা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করা অবসরে যাওয়া ব্যাংকাররাও এখন রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হতে পারবেন। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিদ্যমান নীতিমালা বদলে নতুন নীতিমালা তৈরি করছে।
নতুন নীতিমালার নাম হবে ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নীতিমালা-২০২৫’।
নতুন নীতিমালায় প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের এমডি হওয়ার জন্য গোয়েন্দা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। যদিও বর্তমান ব্যবস্থাতেও প্রতিবেদন নেওয়া হয়, তা নীতিমালায় উল্লেখ ছিল না। নতুন নীতিমালায় এমডি ছাড়াও বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ডিএমডি ও জিএম নিয়োগ ও পদোন্নতিতেও একই প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক হবে।
অবসরে যাওয়া ব্যাংকারদের মধ্য থেকে এমডি নিয়োগের বিধান যুক্ত হলে ৬৫ বছরের কম বয়সী সাবেক ব্যাংকাররাও এমডি হওয়ার সুযোগ পাবেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর জন্য এই বিধান আনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জিএম থেকে এমডি নিয়োগ ও পদোন্নতির নতুন নীতিমালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সায় আছে। ব্যাংকাররা সাধারণত ৫৯ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। যেহেতু এমডি চুক্তিভিত্তিকভাবে ৬৫ বছর পর্যন্ত থাকতে পারবেন, তাই উদ্যোগটিকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। এতে সৎ, পরীক্ষিত ব্যাংকারদের ব্যাংক খাতে অবদান রাখার সুযোগ হবে।”
বর্তমানে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হয় ব্যাংকের বর্তমান এমডি বা ডিএমডি থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে। নতুন নীতিমালায় অবসরে যাওয়া এমডি ও ডিএমডিরাও বাছাই তালিকায় রাখা যাবে। এ বিধান ইতিমধ্যেই খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি ও বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, “অবসরে যাওয়া ভালো ব্যাংকারদের এমডি হওয়ার সুযোগ তৈরি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অবশ্যই থাকা উচিত। এমডিদের মাস্টার্স পাস থাকা জরুরি। তবে ৫০ বছরের কম বয়সী কেউ এমডি হতে না পারার বিধান থাকা উচিত। অভিজ্ঞতার একটি দাম আছে।”
ডিএমডি ও জিএম নিয়োগেও নিয়ম বদলানো হচ্ছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ডিএমডি পদে নিয়োগের জন্য ২০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং এর মধ্যে জিএম হিসেবে দুই বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। জিএম পদে নিয়োগের জন্য মোট ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ডিজিএম পদে ছয় বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
উচ্চতর পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে ডিএমডি পদে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা, এসপিও পদে ১৪ বছর, এজিএম পদে ১১ বছর এবং ডিজিএম পদে ৮ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। জিএম পদে সরাসরি নিয়োগে পিও হিসেবে ১৫ বছর, এসপিও ১২ বছর, এজিএম ৯ বছর এবং ডিজিএম ৬ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক।
নিয়োগ বাছাই কমিটিও বদলানো হচ্ছে। বর্তমান ছয় সদস্যের কমিটি সাত সদস্যের হবে। অর্থমন্ত্রী কমিটির চেয়ারম্যান থাকবেন। সদস্যরা থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থসচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ও জনপ্রশাসন সচিব। সদস্য সচিব হিসেবে থাকবেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব। কমিটির সুপারিশ মেনে নিয়োগ চূড়ান্ত করবেন প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, “ব্যাংক খাতের সার্বিক স্বার্থে নীতিমালার খসড়া শেষ পর্যায়ে আছে।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের এমডি হওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা কঠোর করা হচ্ছে। ন্যূনতম স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকতে হবে এবং শিক্ষাজীবনে কোনো সময়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না। এসএসসি ও এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় জিপিএ ৩-এর কম থাকা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিজিপিএ ৪ পয়েন্ট মাত্রার ক্ষেত্রে ২.৫-এর কম এবং ৫ পয়েন্ট মাত্রার ক্ষেত্রে ৩-এর কম হলে গ্রহণযোগ্য হবে না।
নতুন নীতিমালা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকারদের জন্য এমডি হওয়ার পথ খুলছে। এটি ব্যাংক খাতে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মূল্যায়নকে আরও প্রাধান্য দিচ্ছে। দুদক প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মান নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বয়সের যৌক্তিক সীমা বজায় রেখে নেতৃত্বের মান বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বাড়বে। নতুন নীতিমালা ব্যাংক খাতের সার্বিক স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

