চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ খালাসের সময় কমলেও নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। স্থলেই জট তৈরি হচ্ছে, কাস্টমসের ধীর প্রক্রিয়ার কারণে।
নতুন ডেডিকেটেড জেটি চালুর ফলে জাহাজগুলোকে সাগরে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয় না। প্রতিটি জাহাজে দৈনিক ডেমারেজ বিলসহ ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হচ্ছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চট্টগ্রাম ড্রাইডক নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চালুর পর টার্নঅ্যারাউন্ড সময় পাঁচ দিন থেকে কমে দুই দিনে নেমেছে।
তবে এই অগ্রগতি কাস্টমস প্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে থমকে যাচ্ছে। ১৯ আগস্ট পর্যন্ত বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনারের জায়গা ৯০ শতাংশের বেশি পূর্ণ ছিল। মোট ধারণক্ষমতা ৫৩,৫১৮ টিইইউ হলেও সেখানে ছিল ৪৮,৫৪১ টিইইউ কনটেইনার। কর্মকর্তারা বলছেন, বন্দরের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে অন্তত ১৫–২০ শতাংশ জায়গা খালি থাকা উচিত।
কাস্টমস জটের প্রধান কারণ কার্যকর স্ক্যানারের অভাব। বন্দরের ৯টি স্ক্যানারের মধ্যে চারটি অচল। এতে আমদানি কনটেইনারের গতি মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে গেছে। এক ধরনের ‘ডমিনো এফেক্ট’ তৈরি হচ্ছে—রপ্তানি পণ্য ডেলিভারি শেষে ট্রাকগুলো খালি ফিরে যাচ্ছে, আর ইনল্যান্ড ডিপোগুলোতে কনটেইনার জট বাড়ছে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, “ডিপো মালিকরা কনটেইনার প্রত্যাশিত গতিতে নিতে পারছেন না। ২১টি অফডকে ৭৬ হাজার কনটেইনার আটকে আছে, যার মধ্যে ৬০ হাজার খালি কনটেইনার।”
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের জয়েন্ট কমিশনার মোহাম্মদ তফছির উদ্দিন ভূঁঞা জানান, “চারটি স্ক্যানারের মধ্যে দুটি মেরামত হয়েছে। বাকি দুটি এখনও অচল। মেরামতের জন্য যন্ত্রাংশ আমদানি করতে সময় লাগবে।”
দীর্ঘদিনে ১০ হাজারের বেশি কনটেইনার এখনও খালাস হয়নি। এর মধ্যে কিছু ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পড়ে আছে। বন্দরের মোট জায়গার ২০ শতাংশের বেশি দখল করছে। নতুন সরকারি আদেশ অনুযায়ী, এবার প্রথম নিলামেই এসব কনটেইনার খালাস সম্ভব। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি মাসে ২৫০–৩০০ টিইইউ খালাস করা হবে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের মুখপাত্র এইচ এম কাবির বলেন, “হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বেড়েছে, কিন্তু ডেলিভারি চাপও বেড়েছে। জট কমাতে কিছু বিষয়ে সমন্বয় দরকার।”
কাস্টমস বিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পখাত
শুধু যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, প্রক্রিয়াগত জটিলতাও আমদানিকারকদের সমস্যায় ফেলছে।
ওয়ার্কা ও জোবায়ের এগ্রো ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের মালিক ইয়াসির আরাফাত ২৭.৫ টন পিংক সল্ট আমদানি করেন। কাস্টমসের সব প্রক্রিয়া শেষ ও শুল্ক পরিশোধের পরেও ১৩ দিন পার হয়ে কনটেইনারটি এখনও খালাস পায়নি। আরাফাত বলেন, “আমার কারখানার কাঁচামাল নেই, এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ। এমন চলতে থাকলে ব্যবসা করা কঠিন।”
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, “বন্দর ২৪ ঘণ্টা সচল, কিন্তু কাস্টমস সেই গতিতে কাজ করে না। ফাইল আটকে রাখার কারণ দুর্নীতি। সরকারকে আরও জনবল দিতে হবে এবং দুর্নীতি রোধ করতে হবে।”
ক্লিয়ারিং এন্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব কাজী মাহমুদ ইমাম বলেন, “কনটেইনার ছাড়তে সাধারণত ৪-৫ দিন লাগে। ল্যাব টেস্টের প্রয়োজন হলে ১৫–২০ দিন সময় লাগে। এতে আমদানিকারকরা হয়রানির শিকার হন। ল্যাব সুবিধা ও জনবল বাড়ানো জরুরি।”
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কেবল জাহাজ ভেড়ার জায়গা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। কাস্টমস ডিজিটালাইজেশন, নষ্ট স্ক্যানার মেরামত, পরিত্যক্ত কনটেইনার দ্রুত নিলামে তোলা এবং ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণ জরুরি। অন্যথায় জট দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নেবে।
মেরিটাইম এক্সপার্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরি বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের লজিস্টিক্সে দক্ষ পরিচালকের অভাব রয়েছে। পেশাদার নিয়োগ করলে ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে।”
বাড়তি চাপ মোকাবিলার চেষ্টা
৭ জুলাই থেকে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আউটার অ্যাংকারেজে জাহাজ জট অনেকটা কমেছে। আগে প্রতিদিন ১৭–২০টি জাহাজ অপেক্ষা করত, এখন তা কমে ৫–৬টিতে নেমেছে। টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম পাঁচ দিন থেকে দুই দিনে নেমেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। কনটেইনার জাহাজের জেটি ১০ থেকে বাড়িয়ে ১২–১৩ করা হয়েছে। ফলে ১ আগস্টে ২০টি জাহাজ অপেক্ষমাণ ছিল, ১৯ আগস্ট তা কমে সাতটিতে নেমেছে।
বন্দর তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্টে ৯,৬৪৪টি টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডেল হয়েছে, যার মধ্যে ৪,৫৮৯টি আমদানি ও ৫,০৫৫টি রপ্তানি/ফাঁকা। দ্রুত খালাসের ফলে ইয়ার্ডে কনটেইনার সংখ্যা বেড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে তিনটি টার্মিনালে মোট ১৮টি জেটি আছে। নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালে চারটি, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালে দুটি কনটেইনার জাহাজের জন্য নির্ধারিত। বাকি ১২টি জেটির মধ্যে ছয়টি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে, ছয়টি সাধারণ কার্গোর জন্য।
বন্দর কর্মকর্তারা জানান, ইয়ার্ডে কনটেইনারের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু বার্থিং সক্ষমতা ও দৈনিক হ্যান্ডলিং রেট বেড়ে সার্বিকভাবে জট কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর ৩.২৭৬ মিলিয়ন টিইইউ হ্যান্ডলিং করে নতুন রেকর্ড করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, “কনটেইনারের সংখ্যা বেড়েছে, বন্দরের সক্ষমতাও বেড়েছে। এখন প্রায় ৬০,০০০ টিইইউ ধারণক্ষমতা আছে। তবে চারটি স্ক্যানার নষ্ট হওয়ায় খালাসে বিঘ্ন ঘটেছে।”
বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, “নিউ মুরিং টার্মিনালে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধান হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ৩০ শতাংশ বাড়িয়েছে, জাহাজ অপেক্ষার সময়ও কমেছে।”

