২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানি আয় ছিল ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ৮১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। জাতিসংঘের হিসাব বলছে, একক এ খাতের ওপর নির্ভরশীলতা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স (ইউএন ডিইএসএ) প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ‘ট্যারিফ শকস অ্যান্ড গ্র্যাজুয়েশন ফ্রম দ্য লিস্ট অব লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রিজ’ এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতির প্রভাব নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে শুল্কহার বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর আগে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানির গড় শুল্কহার ছিল ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। নতুন নীতির ফলে তৈরি পোশাকের ওপর কার্যকর শুল্কহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি আয় প্রায় ২১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। শুধু ১০ শতাংশ শুল্ক বাড়ালেই রফতানি আয় কমতে পারে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। আর ঘোষিত হারের মতো বাড়লে ক্ষতি দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এতে মোট রফতানি আয় কমবে প্রায় ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।
জাতিসংঘের হিসাবে, দেশের মোট রফতানি জিডিপির ১২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। হঠাৎ আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান ও শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বড় ধাক্কা খাবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে, যেখানে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করছে।
বাংলাদেশের মোট রফতানির ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে পোশাকের ভাগ ৮৭ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন শুল্ক নীতি সরাসরি এ খাতকে বিপর্যস্ত করতে পারে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হবে। তবে বিশেষ সুবিধা হারালে, যেমন ডিউটি-ফ্রি ও কোটামুক্ত সুবিধা, তখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রতিক্রিয়া ও প্রেক্ষাপট
জাতিসংঘ বলছে, শুধু বাংলাদেশ নয়, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পথে থাকা অনেক দেশই শুল্ক আঘাতে ঝুঁকির মুখে। তাই রফতানির বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার খোঁজা এবং নীতিগত সহায়তা জোরদার করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দেয়ার দাবি উঠেছে। প্রথমে সরকার দৃঢ় অবস্থান নিলেও ব্যবসায়ীদের চাপে এখন কিছুটা নমনীয় হয়েছে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে গ্র্যাজুয়েশন দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হবে। তাই প্রয়োজনে গ্র্যাজুয়েশন পেছানো উচিত।
অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, বাংলাদেশ চাইলে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে আবেদন করতে পারে। তবে এর জন্য মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের ভিত্তিতে শক্ত যুক্তি দাঁড় করাতে হবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, আবেদন করলে প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তবে সময় পাওয়া গেলে ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আবেদন করলেও প্রস্তুতিতে শৈথিল্য আনা যাবে না।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ মনে করেন, কমপক্ষে তিন বছরের সময় দরকার। অন্যদিকে নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ৩ থেকে ৬ বছর সময় পাওয়া জরুরি, নইলে শিল্প ও অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, রফতানি খাতের পাশাপাশি ওষুধ শিল্পও মেধাস্বত্বের নিয়মে নতুন বাধার মুখে পড়বে। ফলে ওষুধের দামও বাড়তে পারে।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৮ সালে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার সূচকে উত্তীর্ণ হয়ে গ্র্যাজুয়েশনের যোগ্যতা অর্জন করে। এরপর ২০২১ সালের মূল্যায়নেও বাংলাদেশ সব সূচকে পাস করে। এশিয়ার মধ্যে একমাত্র দেশ হিসেবে টানা তিনবার মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হয় বাংলাদেশ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তীর্ণ হবে। তবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বৈশ্বিক সংকট, অভ্যন্তরীণ চাপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের জন্য টেকসই হবে না।

