চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ডোমাখালী-সাহেরখালী মোহনায় দেশের চারটি ইলিশ প্রজনন অঞ্চলের একটি অবস্থিত। বাকি তিনটি হলো পশ্চিম সৈয়দ আউলিয়া পয়েন্ট-তজুমদ্দিন, গণ্ডামারা-বাঁশখালী ও লতাচাপালি কলাপাড়া এলাকায়। এই অঞ্চলগুলোতে ইলিশের নিরাপদ প্রজনন হয়। তবে শিল্পায়নের কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মিরসরাইয়ে গত পাঁচ বছরে ইলিশ উৎপাদন কমেছে ২৪৩ দশমিক ৪৯ টন।
স্থানীয় মৎস্যজীবীরা বলছেন, একসময় জেলে নারীরা গ্রামে ঘুরে ঘুরে ইলিশ বিক্রি করতেন। এখন তাদের দেখা পাওয়া যায় না। মায়ানি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের জেলে রণজিৎ জলদাশ জানান, “ইলিশ এখন সোনার হরিণ। আগে সাহেরখালী-ডোমখালী এলাকায় প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। এখন গভীর সমুদ্রে গেলেও পাওয়া যায় না। প্রজনন অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন কমেছে।”
ইলিশ প্রজনন অঞ্চল বলতে নদী বা সাগরের বিশেষ জায়গাকে বোঝায়, যেখানে মাছ ডিম ছাড়ে এবং বাচ্চা জন্মায়। এ এলাকায় নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে মাছের আনাগোনা বেশি হয়। নদীর মোহনা ও উপকূলীয় অঞ্চলে ডিম থেকে রেণু বা জাটকা বড় হয়ে সাগরে ফিরে যায়।
সরকার প্রতি বছর ইলিশ সংরক্ষণে নানা পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে রয়েছে দুই দফায় ৮৭ দিনের নিষেধাজ্ঞা, আট মাসব্যাপী জাটকা আহরণ বন্ধ ও জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালন। এছাড়া প্রতি বছরের ২০ মে থেকে ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। এই সময়ে মিরসরাইয়ের ২ হাজার ১২৬টি জেলে পরিবারকে দুই দফায় ৮৬ কেজি চাল দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মিরসরাইয়ে ২৯টি জেলেপল্লীতে নিবন্ধিত মৎস্যজীবী রয়েছেন ২ হাজার ৫৫৭ জন। ২০১৬ সালের আগে ২ হাজার ২৬ জন নিবন্ধিত ছিলেন। ২০২১ সালে নিবন্ধন পান ১০০ জন, পরের বছর আরও ৪৩১ জন। প্রধান প্রজনন মৌসুমে সরকার ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ ও বাজারজাত নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই সময়ে ১ হাজার ৫০০ পরিবার ২৫ কেজি করে চাল পান। নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত আট মাসের নিষেধাজ্ঞায় ৬২০ পরিবারকে মাসে ৪০ কেজি চাল দেওয়া হয়। তবে ভিজিএফ সহায়তা শুধু চার মাসে দেওয়া হয়। প্রজনন অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সোনালি স্বপ্নের সাবেক সভাপতি মনিরুল হোসেন টিপু বলেন, “ডোমখালী ও সাহেরখালী খালের মোহনায় একসময় মা-মাছ ডিম ছাড়তো। কিন্তু জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বালি উত্তোলন ও শিল্পায়নের প্রভাবে প্রজনন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য উৎপাদন কমেছে।”
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে মিরসরাইয়ে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ২৫২ দশমিক ৩ টন। ২০২২ সালে কমে ১৪৭ দশমিক ৪ টন, ২০২৩ সালে ১১৬ টন, ২০২৪ সালে ৩৬ দশমিক ৪৯ টন এবং চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই পর্যন্ত ৮ দশমিক ৮১ টন।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, “প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হওয়ায় ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে ঘাটগুলো বদলে যাওয়ায় ইলিশ আহরণ কমেছে। উৎপাদন বাড়াতে আমরা নিষেধাজ্ঞার দিনগুলোয় নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি।”

