বিশ্বের বহু দেশে সরকারি ব্যয় বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে বাজেট ঘাটতি। ঘাটতি পূরণের জন্য ঋণ নেওয়া বেড়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের ঋণের আকার এখন বিপুল। ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের ব্যয় আরও বাড়ছে।
কিছু দেশ সরকারের চাপের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কমানোর দিকে ঝুঁকছে। আবার বাজার পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে নীতি গ্রহণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী বছরগুলোতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নীতি নির্ধারণে স্বাধীন থাকবে না। সরকারের আর্থিক নীতি বা ‘ফিসকাল পলিসি’ প্রভাবিত হতে পারে মুদ্রানীতিতে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন বছরগুলোতে আমরা ‘ফিসকাল ডমিন্যান্স’-এর যুগ দেখতে পাব।
যুক্তরাষ্ট্রে এই চাপ সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভকে নিয়মিত হুমকির মধ্যে রেখেছেন ঋণের সুদ কমাতে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও জাপানে সরকারি ঋণের বোঝা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নীতি শিথিল করতে বাধ্য করছে, যদিও সরাসরি চাপ নেই।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ বলেছেন, ‘সরকারি ঋণ ও খরচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। আমরা নতুন ফিসকাল ডমিন্যান্সের যুগে প্রবেশ করেছি।’
যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি বন্ডের সুদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সুদ বাজারের নিয়ন্ত্রণে। বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি সুদ কম, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বেশি। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন ফেড নীতি শিথিল রাখার দিকে বেশি মনোযোগী। দুই ও ৩০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের সুদহারের ব্যবধান ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে।
যুক্তরাজ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গিল্টে (বন্ড) ইল্ড এখন ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি। তুলনায় মার্কিন ৩০ বছরের বন্ড ইল্ড প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত তথ্যের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে আক্রমণ করেন। তখন দুই বছরের বন্ডের ইল্ড হ্রাস পায়, কিন্তু ৩০ বছরের বন্ডের ইল্ড বেড়ে যায়। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের বিশ্লেষকরা বলছেন, এর প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক ছিল, যা হোয়াইট হাউজের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে আরও পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়।
সম্প্রতি ফেড বোর্ডে স্টিফেন মিরানকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিনি সুদ কমানোর পক্ষে চাপ দেবেন। ট্রেভর গ্রিথাম, রয়্যাল লন্ডন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, বলছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে ফিসকাল ডমিন্যান্সের ঝুঁকি বাড়ছে।’
অন্যান্য দেশেও সরকারি ব্যয় ও ঋণ চাপ বাড়ছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নেই। OECD-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর উন্নত দেশগুলোর সরকারি ঋণ ১৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। ২০২৪ সালে এটি ছিল ১৬ ট্রিলিয়ন, আর ২০২৩ সালে ১৪ ট্রিলিয়ন।
এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে নীতিমালা স্বাভাবিক করতে চাইছে। দীর্ঘদিন কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং বা সরকারি বন্ড কিনে রাখা হ্রাস করতে চাইছে। তবে বন্ড বিক্রি করলে সুদহার বাড়তে পারে এবং ঋণের খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে।
কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, সরকার স্বল্পমেয়াদি ঋণে ঝুঁকবে। এতে সুদহার ওঠানামা বাড়বে। ম্যাথিউ মরগান, জুপিটার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, বলছেন, ‘বাজারে সুদহারের উচ্চ ওঠানামা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ রাখা কঠিন করছে।’ প্রখ্যাত বিনিয়োগকারী রে ডেলিও সতর্ক করেছেন, ঋণের ইল্ড খুব বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করবে। এতে টাকা ছাপাতে হবে এবং বন্ড কিনতে হবে, যা মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটাবে।

