চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন ভাড়া কাঠামো নিয়ে বন্দরের কর্তৃপক্ষ ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলমান। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পরিবহন মন্ত্রণালয় আগামী ২৫ আগস্ট একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ডেকেছে।
বৈঠকটি ঢাকায় মন্ত্রণালয়ের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হবে। এর সভাপতিত্ব করবেন শিপিং এডভাইজার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি (সিপিএ) ও বন্দরের ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধি বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন। বৈঠকের অফিসিয়াল আমন্ত্রণপত্র গত ২০ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রাম পোর্ট সেলের ডেপুটি সেক্রেটারি মোহাম্মদ সাইফুর রহমান জারি করেছেন।
চট্টগ্রাম পোর্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ ভাড়া ১৯৮৬ সালে নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে পাঁচটি ক্যাটেগরিতে সামান্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল কিন্তু বাকি ৫১টি সেবা চার্জ দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত থেকে গেছে। সিপিএ বলছে, ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক কনসালট্যান্সি আইডিএম কনসালটিং এবং লজিকফোরামের পর্যালোচনায় নতুন ভাড়া কাঠামো প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়। তাদের রিপোর্টে বলা হয়, আধুনিক মানদণ্ড অনুযায়ী বন্দরের ভাড়া পুনঃনির্ধারণ জরুরি।
একটি জাহাজ চট্টগ্রামে আসলে এখানে বিভিন্ন সেবা পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পাইলটেজ, টাগবোট সহায়তা, ক্রেন চার্জ, পানি সরবরাহ, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং ডেলিভারি। মোটামুটি ৫৬ ধরনের সেবা জাহাজের জন্য প্রদান করা হয়। এগুলো ইউএস ডলারে আদায় করা হয় এবং একত্রে এই চার্জগুলোকে ‘ভাড়া’ বলা হয়।
তবে ব্যবহারকারীরা সিপিএর দাবিকে স্বীকার করছেন না। শিপিং এজেন্ট ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, টাকার মান হ্রাসের কারণে গত কয়েক বছরে কার্যত ভাড়া প্রতি বছর বেড়ে গেছে। নতুন প্রস্তাবিত ভাড়া বৃদ্ধির ফলে শিপিং খরচ আরও বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করবে।
পোর্ট ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশনও এই সিদ্ধান্তের বিরোধ জানিয়েছে। তাদের মতে, চট্টগ্রাম একটি সেবা-ভিত্তিক বন্দর, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। ভাড়া বাড়লে আঞ্চলিক বাণিজ্যে দেশের প্রতিযোগিতা কমতে পারে। তারা বলছে, উচ্চ ভাড়া রপ্তানি-আমদানি খরচ বাড়াবে, যার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতেও পড়বে।
এ বিষয়ে আরও বলা হয়েছে, ২৪ জুলাই ২০২৫ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় পরিবহন মন্ত্রণালয়ের “চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি ২০২৫-এর জন্য পণ্য ও জাহাজের ভাড়া” প্রস্তাবনায় নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) জারি করেছে। এটি স্বাক্ষর করেছেন ট্রেজারি অ্যান্ড ডেব্ট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মনোয়ারা পারভিন মিতু।
সিপিএ জানাচ্ছে, পূর্বে ভাড়া পরিবর্তনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৩ সালে একটি পর্যালোচনা শুরু করা হয়েছিল, কিন্তু মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেয়নি। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক কনসালট্যান্সি নিয়োগ করা হয়, তবে বাস্তবায়ন দীর্ঘদিন স্থগিত থাকে।
এ বছরের জুনে, সিপিএ সেবা ভাড়ায় ৭০ থেকে ১০০% বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছিল। ব্যবহারকারীদের বিরোধের কারণে পরে এটি প্রায় ৪৪% এ নামানো হয়। নতুন ভাড়া কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও ব্যবহারকারীরা এখনও বিরোধী। এ অবস্থায় পরিবহন মন্ত্রণালয় ২৫ আগস্ট বৈঠক ডেকেছে, যাতে ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব ও বিরোধ সমাধান করা যায়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ সময় ধরে ভাড়া অপরিবর্তিত থাকায় সিপিএ বলছে, আধুনিকায়ন ছাড়া বন্দরের সেবা ব্যয় ও মান বজায় রাখা কঠিন হবে। অন্যদিকে ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, উল্লিখিত বৃদ্ধি দেশের রপ্তানি-আমদানি খরচ বাড়াবে এবং ক্রেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। বৈঠকের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে, কীভাবে দেশের প্রধান বন্দরটি সমন্বিত ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হবে।

