রাজশাহীতে সুস্বাদু ও মনোরম গন্ধযুক্ত মিষ্টি পান চাষ এখন কৃষকের জন্য অন্যতম লাভজনক নগদ ফসল হিসেবে পরিচিত। শুধু কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, স্থানীয় অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করছে। মিষ্টি পান চাষের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “মিষ্টি পান মোট পান চাষের ৭০ শতাংশের বেশি এবং এটি কৃষকের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। অনেক কৃষক এখন ধান, পাট বা অন্যান্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভের কারণে পান চাষে মনোযোগ দিচ্ছেন।”
রাজশাহীর মাটি এবং আবহাওয়া পান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত। এতে কম খরচে বেশি উৎপাদন সম্ভব। অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় পান চাষ কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং আয় বেশি। কৃষকরা তাই ধীরে ধীরে এ দিকে ঝুঁকছেন।
পান মূলত আঠা এবং সুপারি সঙ্গে চিবিয়ে খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। দেশের চাহিদা মেটানোর পর বাকি উৎপাদিত পাতা বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। ডিএই সূত্র জানিয়েছে, এ অঞ্চলের ৭২,৭৬৪ জন কৃষক শুধু স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন না, দেশের রপ্তানি আয়েও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন।
সিরাজুল ইসলাম আরও বলেন, “যখন ধান বা পাটের ফসল থেকে লাভ কম হয়, কৃষকরা উচ্চ লাভের জন্য পান চাষ বেছে নেন। এ কারণে পান শিল্প নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করছে।”
মোহনপুর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুন জানান, স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি পান বিক্রি হয় ২৫০ টাকা। ডিএই-এর উপ-পরিচালক উম্মে কুলসুম জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৪৯৯.২৩ হেক্টর জমিতে ৭৬১৫১.৮২ টন পান উৎপাদিত হয়েছে, যা ১৫৬১.৯ কোটি টাকা আয় করেছে। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৪৩১১ হেক্টর জমিতে ৭২৩৩০.৩৪ টন উৎপাদন হয়েছে।
জেলার নয়টি উপজেলায় দুই ধরনের পান চাষ করা হয়—মিষ্টি এবং সাঁচি। তবে মিষ্টি পান এখনো কৃষক ও ভোক্তার কাছে শীর্ষ পছন্দ। পাতাগুলো পরিপক্ব হতে পাঁচ-ছয় মাস সময় লাগে এবং পরবর্তীতে প্রতি ৮-১০ দিনে একবার কাটা যায়।
মোহনপুরের বাকশাইল গ্রামের কৃষক মনিমুল হোসেন বলেন, “আমরা এটিকে ‘সোনার পাতা’ বলি, কারণ এটি সবচেয়ে লাভজনক ফসল। ৩০ কাঠা জমি থেকে আমি ১৬ লাখ টাকা আয় করেছি।” মোগাছি গ্রামের আলী হোসেন রিয়াদ বলেন, ১০ কাঠা জমি থেকে তিনি ৪-৬ লাখ টাকা আয় পান।
বাঘমারা উপজেলার পান ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার বলেন, “স্থানীয় এবং বৈশ্বিক চাহিদা উভয়ই প্রচুর। আমি দূরের গ্রাম থেকে পান সংগ্রহ করে সারাদেশে বিক্রি করি। আমার মাসিক আয় প্রায় ৭০ হাজার টাকা।”
চাঁদপুর গ্রামের আবদুল হামিদ বলেন, “পান চাষের মাধ্যমে আমি স্বাবলম্বী হয়েছি। বাঘমারার পাতার চাহিদা বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরে বেড়েছে। পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের, বিশেষ করে সৌদি আরবের বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারিত হয়েছে।”
এলকনগর বাজার এখন প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এটি পাইকারি এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য আকর্ষণীয়, কারণ এখান থেকে তারা সহজে জোগান নিতে পারছেন।
ডিএই-এর অতিরিক্ত পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, “পান কেবল বিয়ে, জন্মদিন বা বৈশাখী উৎসবে ব্যবহৃত হয় না। এতে ঔষধি গুণ রয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে এর ব্যবহার বাংলাদেশের কৃষি খাতকে শক্তিশালী করেছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা কৃষকদের বৈজ্ঞানিক চাষপদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। যদি সরকার স্থায়ীভাবে সহায়তা দেয়, তবে কৃষকরা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে সক্ষম হবেন।”
মোস্টকিমা খাতুন ও উম্মে কুলসুমের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহীর পান চাষের আয় ১৫৬১.৯ কোটি টাকা। এটি শুধু কৃষককে অর্থনৈতিক সুরক্ষা দেয়নি, দেশকে রপ্তানি রাজস্বও যোগ করেছে।
এছাড়াও, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পান চাষ আরও বৈজ্ঞানিক ও লাভজনক হয়ে উঠছে। কৃষকেরা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াচ্ছেন, যা দেশের কৃষি ও অর্থনীতি দুটোর জন্যই সহায়ক।
সর্বশেষ, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে মিষ্টি পান চাহিদা বাড়ায়, কৃষকরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। পান চাষ কেবল আয় নয়, বরং কৃষকের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

