বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক পাওয়া গেছে। দেশ এখনো ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোর প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। “আমাদের প্রশাসন এখনো মূলত শাস্তি আরোপের ক্ষমতার ওপর কেন্দ্রিত। নীতি নির্ধারণ ও মানবকল্যাণ কার্যক্রমের তুলনায় পুলিশের ও ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা বেশি।”
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা ক্ষমতা বিভাজনের মাধ্যমে একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করেছিলেন। কর নেওয়া, বিচার ও পুলিশিং ক্ষমতা আলাদা রাখা হলেও, বিচার ও পুলিশ ক্ষমতা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে কেন্দ্রিত রাখা হয়। ফলে অপরাধমূলক ক্ষমতা কড়া নিয়ন্ত্রণাধীন, আর দেওয়ানি বা নাগরিক মামলায় দীর্ঘ সময়, জটিলতা ও দুর্নীতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
অর্থনীতির দিক থেকে বাংলাদেশের রূপান্তর চিত্তাকর্ষক। ১৯৮০-এর দশক থেকে দেশটি সংহত জাতীয় অর্থনীতির দিকে এগিয়েছে। গ্রামীণ সড়ক, মাইক্রোক্রেডিট, প্রেরিত রেমিট্যান্স—এসব নতুন উন্নয়ন চালক হিসেবে কাজ করেছে। নারীর শিক্ষাগত ও স্বাস্থ্যগত উন্নয়ন তাদের শ্রমশক্তি ও উদ্যোক্তা মনোভাবকে সক্রিয় করেছে। তবে, বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন, “আমরা এখনও নিম্নমূল্য শ্রম নির্ভর অর্থনীতিতে আটকে আছি। তৈরি পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্স নির্ভর কাজগুলো কম মূল্যের শ্রমের ওপর নির্ভর।” অর্থাৎ, এই মডেল দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও উন্নয়নকে সীমিত করছে।
মানব সম্পদ বিনিয়োগে ঘাটতি আরেকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি যা অর্জন করেছে, তা মূলত শক্তিশালী মানবসম্পদ বিনিয়োগের কারণে। বাংলাদেশে যদিও নানা প্রকল্প আছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার না থাকায় অর্জিত সাফল্য অনেকটা খুঁতখুঁতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ। গণতন্ত্র, প্রতিযোগিতা ও মেধা-ভিত্তিক সুযোগ সৃষ্টি ছাড়া উন্নয়নকে আরো প্রসারিত করা সম্ভব নয়। বর্তমানে ‘লোহত্রয়’ নামে পরিচিত ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ এলিটদের নিয়ন্ত্রণ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগকে সীমিত করছে। এজন্য প্রসারিত মানবসম্পদ বিনিয়োগ, সেবা খাতের বিকাশ, কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য।
শহর ও গ্রামের একীভূত রূপান্তর, নতুন গ্রামীণ ও নগর বাস্তবতা, এবং প্রযুক্তি ও সেবাখাতের বিস্তার একদিকে যেমন অগ্রগতির নতুন পথ তৈরি করেছে, অন্যদিকে এটি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার প্রয়োজনকেও নির্দেশ করছে। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হার নয়, বরং চাকরির সুযোগ, বৈষম্য কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ বিনিয়োগই হবে দেশের স্থায়ী অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি।

ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক উত্তরাধিকার: বাংলাদেশে প্রশাসনিক কাঠামোতে আজও ব্রিটিশ ঔপনিবেশের প্রভাব দৃঢ়ভাবে বিরাজ করছে। এটি বিশেষভাবে দেখা যায় শাস্তি আরোপের ক্ষমতা এবং নীতি প্রণয়ন ক্ষমতার মধ্যে অসমতা থেকে। মূল বিষয়গুলো হলো:
- শক্তি কেন্দ্রায়ন ও নির্বাহী কর্তৃত্ব: ঔপনিবেশিক শাসন প্রশাসনের কেন্দ্রীয়করণ ঘটিয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশিং ক্ষমতা স্থানীয় নীতি প্রণয়নের উপরে প্রাধান্য পায়। ফলে প্রশাসন মূলত শাস্তি আরোপের ব্যবস্থায় নিয়োজিত থাকে, জনকল্যাণ বা নীতি বাস্তবায়নকে পিছনে ফেলে।
- দারোগা পদ্ধতি ও আনুগত্যের স্থাপন: ব্রিটিশরা ১৭৯২ সালে দারোগা পদ্ধতি চালু করে পুলিশিংকে রাষ্ট্রের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ করে তুলেছিল। নিম্নবর্গের পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যাতে তারা স্থানীয় জমিদারদের চাপে না পড়ে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যী থাকে। আজও এই আনুগত্য-কেন্দ্রিক প্রশাসনিক মনোভাবের ছাপ দেখা যায়।
- ক্ষমতার বিভাজন এবং তার ফলাফল: ঔপনিবেশিক প্রশাসন কর সংগ্রহ, বিচার ও পুলিশিং ক্ষমতা আলাদা করেছিল। কর জমিদারদের হাতে রাখা হলেও, বিচার ও পুলিশ ক্ষমতা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে কেন্দ্রীভূত থাকত। অপরাধমূলক বিচার কড়া প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দেওয়ানি মামলা দীর্ঘ ও জটিল হয়ে ওঠে। এর ফলে বিচার প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং দুর্নীতিপূর্ণ হয়ে যায়।
- জমিদার ও স্থানীয় শক্তির বিচ্ছিন্নতা: পুলিশ ও বিচারককে স্থানীয় শক্তির চাপে রাখার পরিবর্তে তারা রাষ্ট্রের কাছে দায়বদ্ধ হয়। ব্রিটিশ শাসনের সময় পুলিশ ধীরে ধীরে স্থানীয় জমিদারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যী হয়। এই ধারা আজও বজায় রয়েছে, যার কারণে স্থানীয় স্বার্থ ও জনসেবা প্রায়শই নির্বাহী কর্তৃত্বের নিচে চাপা পড়ে।
অন্তর্গত মানবসম্পদ বিনিয়োগের ঘাটতি: বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অগ্রগতিতে মূল বাধা: মানবসম্পদ উন্নয়ন বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ফুটে উঠেছে। “বাংলাদেশের মানুষের সক্ষমতা আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো সেই সম্পদে যথাযথ বিনিয়োগ না করা।”
- মানবসম্পদ বিনিয়োগের অভাবের প্রভাব: দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে পারেছে মূলত মানবসম্পদে বিনিয়োগের কারণে। বাংলাদেশে যদিও বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প ও শিক্ষাগত উদ্যোগ আছে, তবে তা বিস্তৃত এবং কার্যকর নয়। এর ফলে অর্জিত অগ্রগতি অনেক সময় স্থায়ী হয়নি এবং ক্রমাগত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে।
- শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে ঘাটতি: প্রাথমিক শিক্ষা ও সাক্ষরতার ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে, তবে উচ্চতর শিক্ষার মান এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে যথাযথ বিনিয়োগ নেই। ফলে উদীয়মান শিল্প ও সেবা খাতের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চদক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না।
- উদ্যোক্তা ও শ্রমিক শক্তি: সাধারণ মানুষের উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা মনোভাব অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি হলেও, রাষ্ট্রের সহায়ক নীতি ও প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ না থাকায় এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগছে না। মাইক্রোক্রেডিট বা নগর-গ্রামীণ সড়ক ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ সীমিত মাত্রায় সাফল্য আনতে পারছে।
- প্রতিষ্ঠানিক সংস্কারের ঘাটতি: মানবসম্পদ উন্নয়ন শুধু প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা নয়। এটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রশাসনিক সংস্কার না থাকায় দক্ষতা এবং উদ্ভাবনের সুযোগ কমে যায়। বর্তমান ব্যবস্থায় প্রজেক্ট-ভিত্তিক উদ্যোগ থাকলেও তা দেশের বৃহত্তর মানবসম্পদ উন্নয়নের চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয়।
- দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: মানবসম্পদে বিনিয়োগ না করার ফলে বাংলাদেশ নিম্নমূল্য শ্রম নির্ভর অর্থনীতির মধ্যে আটকে আছে। তৈরি পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্স নির্ভর অর্থনীতি উচ্চমূল্য বা দক্ষতা নির্ভর শিল্পে রূপান্তরিত হচ্ছে না। এর ফলে দেশের স্থায়ী উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হচ্ছে।
- ক্ষমতার বিভাজন এবং তার ফলাফল: ঔপনিবেশিক প্রশাসন কর সংগ্রহ, বিচার ও পুলিশিং ক্ষমতা আলাদা করেছিল। কর জমিদারদের হাতে রাখা হলেও, বিচার ও পুলিশ ক্ষমতা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে কেন্দ্রীভূত থাকত। অপরাধমূলক বিচার কড়া নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দেওয়ানি মামলা দীর্ঘ ও জটিল হয়ে ওঠে। এর ফলে বিচার প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং দুর্নীতিপূর্ণ হয়ে যায়।
ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক উত্তরাধিকার আজও বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় গভীর ছাপ রেখে গেছে। কেন্দ্রীয়করণ, ক্ষমতার ঘনত্ব, মানবসম্পদ বিনিয়োগের ঘাটতি এবং বিচারব্যবস্থার ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই মূলত ব্রিটিশ আমলের উত্তরাধিকার। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও কাঠামোগত সংস্কার হয়নি বলেই এই ধারা বহাল রয়েছে। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজে ক্ষমতার সুষম বণ্টন হয়নি, বরং প্রশাসনিক আধিপত্যই টিকে গেছে।
অতীতের এই উত্তরাধিকার ভেঙে নতুন পথ তৈরি করতে হলে প্রয়োজন প্রকৃত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, মানবসম্পদে টেকসই বিনিয়োগ এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা। নইলে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও রাষ্ট্র থেকে নাগরিক পর্যন্ত সবাই এক ধরনের ঔপনিবেশিক কাঠামোর ভেতরেই বন্দি থেকে যাবে।

