ভারতীয় আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও সাড়া মেলেনি। বরং বিপিডিবি চিঠির মাধ্যমে এসআরও বা বিধিবদ্ধ আদেশ জারির মাধ্যমে শুল্ক ছাড়ের অনুরোধ জানিয়েছে।
এনবিআর চাইছে ফাঁকি দেওয়া শুল্ক আদায়, বিপিডিবি চাইছে শুল্কছাড়। এ নিয়ে দুই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রশি টানাটানি চলছে। বিপিডিবি জানিয়েছে, শুল্কছাড় না দিলে বিদ্যুতের ট্যারিফ বাড়াতে হবে। তা না হলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। এই অবস্থায় বিপিডিবি চুক্তি অনুযায়ী আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, অগ্রিম আয়কর ও অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট থেকে অব্যাহতির জন্য এনবিআরকে অনুরোধ করেছে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, আমরা শুল্কছাড়ের জন্য এনবিআরকে অনুরোধ করেছি। কিন্তু সাড়া না দিলে চুক্তি অনুযায়ী বিপিডিবি শুল্ক পরিশোধ করবে। বিপুল অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য আমাদের নেই। তা হলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করতে হবে। মূল্যবৃদ্ধি না হলে সরকারকে ভর্তুকি হিসেবে চাইব। তাই শেষ পর্যন্ত দু’টো সরকারি দপ্তরের মধ্যে চিঠি চালাচালি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
গত মার্চে রুহানপুর কাস্টমস স্টেশন আদানির বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিপরীতে চার হাজার ৭৬৮ কোটি ৪৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা শুল্ক পরিশোধের জন্য বিপিডিবিকে চিঠি দেওয়া হয়। ২০২২ সাল থেকে বিপিডিবি শুল্কছাড়ের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত এনবিআরের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। সর্বশেষ গত ৭ জুলাই শুল্কছাড়ের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, আমরা এখনো আলোচনা করিনি। আগে বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ে ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর ২৫ বছরের চুক্তি হয়। এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বিপিডিবি এক হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনে।
শেখ হাসিনার সরকারের পর, আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে অনিয়ম ও শুল্কফাঁকির বিষয়ে এনবিআরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত আদানি থেকে ১০,৫৮,৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হয়। অগ্রিম আয়কর ছাড়া বিপিডিবি ১২৮ কোটি ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ডলার পরিশোধ করেছে। এর ওপর ৩১ শতাংশ শুল্ক ধার্য ছিল। ফলে সরকারকে ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ডলার বা চার হাজার ৭৬৮ কোটি ৪৫ হাজার টাকা জমা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিপিডিবি কোনো টাকা জমা দেয়নি।
চুক্তিতে শুল্ক মওকুফ থাকলেও এনবিআর কোনো আদেশ জারি করেনি। তাই আদানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিপিডিবির কাছ থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা আদায়যোগ্য বলে কমিটি জানিয়েছে। কমিটি সুপারিশ করেছে, শুল্ক আদায়ের জন্য এনবিআরের তিনটি বিভাগ দায়িত্বে থাকবে। এগুলো হলো—রাজশাহী কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, বৃহৎ করদাতা ইউনিট (মূসক) ও ঢাকা কাস্টমস হাউস।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম স্বীকার করেছেন, শুল্ক পরিশোধের দায় বিপিডিবির। মার্চে তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী শুল্কফাঁকির দায় আমাদের বহন করতে হবে। আমরা এনবিআরকে শুল্ক অব্যাহারের জন্য অনুরোধ করেছি। কিন্তু এনবিআর সাড়া দেয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০২২ সালের আগস্টে আদানি গ্রুপ এনবিআরের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দেয়। অন্য ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসি বিদ্যুৎ নিগামের বিদ্যুৎ আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক মওকুফ হয়েছে। আদানি তাদের জন্য একই সুবিধা চাই। কিন্তু শুল্ক ছাড়ের কোনো আদেশ জারি হয়নি।
বিপিডিবি জানায়, ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারির বাংলাদেশ-ভারত সমঝোতা ও সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী তাদের আমদানি করা বিদ্যুতের শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। চুক্তি ও এনবিআরের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ আমদানির কার্যক্রম চলছে। তদন্ত কমিটি এরূপ বক্তব্য মানতে নারাজ। তাদের মতে, শুল্ক-কর অব্যাহারের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট আদেশ নেই। চুক্তি অনুযায়ী, শুল্ক-কর সম্পর্কিত দায় বিপিডিবির। যেহেতু আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে কোনো শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া হয়নি, বিপিডিবি তা পরিশোধ করতে বাধ্য।

