বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই বিপ্লব এক বড় মোড়। দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসন ভেঙে মানুষ মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। ১৬ কোটি মানুষের মনে নতুন স্বপ্ন জেগেছে। সেই স্বপ্ন সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যহীন সমাজ এবং সর্বোপরি একটি টেকসই অর্থনীতির।
কারণ অর্থনীতি স্থিতিশীল না হলে রাষ্ট্রের কাঠামো টেকে না। পেটে ভাত না থাকলে মানুষ আইন-শৃঙ্খলার ধার ধারে না। অপরাধ তখন বেঁচে থাকার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই মৌলিক অধিকারের মধ্যে অর্থনৈতিক অধিকারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ আগে ভাত চায়, তারপর বাকিটা। তবে জুলাই বিপ্লবের পর অর্থনীতির বাস্তব চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। পরিসংখ্যান বলছে, অভ্যুত্থানের আগের রাজস্ব বছর ২০২৪-এ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। বিপ্লবের পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশে।
ব্যাংক খাতেও সংকট গভীর হয়েছে। ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে তা দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশে। মুদ্রাবাজারেও চাপ স্পষ্ট। অভ্যুত্থানের আগের বছরের জুনে ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ১১৭ টাকা। পরের বছর তা বেড়ে হয়েছে ১২২ টাকা। অতএব, জুলাই বিপ্লব রাজনৈতিক মুক্তি এনেছে ঠিকই, তবে অর্থনীতির সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলাই হবে নতুন পথচলার মূল শর্ত।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি সরাসরি ব্যাংকিং খাতের সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল। একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ব্যাংক খাত শক্তিশালী থাকলে জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সুস্থ নেই। সেই প্রভাবই পড়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে।
ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য পরিমাপের প্রধান সূচক হলো খেলাপি ঋণ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি দেশের সহনীয় সীমা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ। উন্নত আর্থিক ব্যবস্থায় তা ৩ শতাংশের নিচে থাকে। অথচ বাংলাদেশে এখন খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশে।
প্রশ্ন উঠছে—এত ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণ কী?
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাস্তবতায় এ চিত্র স্পষ্ট। পতিত সরকারের সময় যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি অনৈতিকভাবে সুবিধাভোগ করেছেন, তাদের অনেকেই বিপ্লবের পর পালিয়ে গেছেন বা আত্মগোপনে রয়েছেন। এদের মধ্যে ট্রেডিং ব্যবসায়ী, কল-কারখানার মালিক, সেবা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা, ব্যাংক মালিক ও ঋণগ্রহীতা—সবাই ছিলেন সরাসরি অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত।
তাদের অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো অচল হয়ে পড়ে। অনেক শিল্প-কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। একটি রফতানিমুখী কারখানার প্রধান উদ্যোক্তা যদি কর্মস্থলে না থাকেন, স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন থেমে যায়। উৎপাদন বন্ধ হলে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রবাহও থেমে যায়।
ফলশ্রুতিতে, শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ পরিশোধ অসম্ভব হয়ে পড়ে। কয়েক মাসের মধ্যে ঋণগুলো খেলাপি হয়ে যায়। একইভাবে এলসির বিপরীতে ব্যাংকের দায়ও তৈরি হয়। নির্ধারিত সময়ে সেই বিল পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাংক বাধ্য হয় ‘ফোর্সড লোন’ তৈরি করতে। এ ধরনের ঋণ মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে শ্রেণীকৃত হয়ে যায়। অতএব, জুলাই বিপ্লব রাজনৈতিক মুক্তি আনলেও অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হয়ে উঠেছে ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের বোঝা কমানো ছাড়া জিডিপির টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।

জুলাই বিপ্লবের পর শত শত ব্যবসায়ী আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় অর্থনীতিতে গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। একদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ হুড়মুড় করে বেড়েছে, অন্যদিকে শত শত কল-কারখানা বন্ধ হয়ে লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা এখন সময়ের দাবি। কারণ অভ্যুত্থানের কারণে হয়েছে কি না, নাকি বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে—এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল বিশ্লেষণ করবে না। তারা দেখবে বাংলাদেশের অর্থনীতি দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, খেলাপি ঋণের প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ খাতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আন্তর্জাতিক লেনদেনেও তা গুরুতর আস্থাহীনতা তৈরি করছে। এরই মধ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের অনেক ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন সংকুচিত করেছে। যেমন—এলসিতে অ্যাড-কনফার্মেশন দেয়া বন্ধ, ডিসকাউন্টিং সুবিধা সীমিত, এলসি অ্যাডভাইজ না করা, ডকুমেন্ট নেগোসিয়েশন না করা, ডিপি এলসিতে অ্যাক্সেপ্টেন্স কার্যকর না করা, এমনকি গ্যারান্টি ইস্যু করতেও অনাগ্রহ প্রকাশ করছে।
অভ্যন্তরীণ খাতেও খেলাপি ঋণের প্রভাব ভয়াবহ। এটি ব্যাংকের ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে। ঋণের ঝুঁকি বেড়ে যায়, মুনাফা কমে যায়। মুনাফা কমলে শেয়ারহোল্ডাররা ডিভিডেন্ড থেকে বঞ্চিত হয়, এতে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা জন্ম নেয়। এর ফলেই অনেক গ্রাহক আমানত তুলে নিচ্ছে, যা ব্যাংক-রানের মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি করছে। সব মিলিয়ে, খেলাপি ঋণ এখন দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এই সঙ্কট কাটাতে জরুরি পদক্ষেপ ছাড়া টেকসই অর্থনীতির পথে এগোনো সম্ভব হবে না।
অর্থনীতির দুর্দশা এখন শুধু অভ্যন্তরীণ খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্প্রতি বৈশ্বিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো বাংলাদেশের রেটিং ঋণাত্মক করে দিয়েছে। ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ব্যবসাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে। এই পরিস্থিতি সরাসরি ব্যবসা-বাণিজ্যে আঘাত করছে। কোনো ব্যাংক যদি গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলতে না পারে, তবে গ্রাহক শুধু ওই ব্যাংকের প্রতি আস্থা হারাবেন না, বরং তার ব্যবসাই থমকে যাবে। বিশেষ করে যদি এলসির মাধ্যমে কারখানার কাঁচামাল আমদানি সম্ভব না হয়, তবে কারখানাটি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যেই অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটছে।

অর্থনীতির স্বার্থে অনেক সময় কিছু অনৈতিক বা অস্বাভাবিক সিদ্ধান্তকেও রেটিফাই করা হয়। যেমন সরকার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়, কখনও ফাঁসির আসামিকে মওকুফ করে, আবার রুগ্ণ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ সুবিধা দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য থাকে সামগ্রিক অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখা। তাই খেলাপি ঋণ কমাতে এখন বিশেষ উদ্যোগ নেয়া জরুরি। না হলে ব্যাংক খাতের অস্থিরতা অর্থনীতির সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই উদ্যোগ কীভাবে নেয়া সম্ভব?
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, অনেকগুলো আবার মৃতপ্রায় অবস্থায় আছে। অথচ অর্থনীতির স্বার্থে এসব প্রতিষ্ঠান পুনরায় সচল করার কোনো বিকল্প নেই। মালিক পক্ষ যদি উদ্যোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালু করতে চায়, তবে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া উচিত। এখানে একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। কেউ যদি রাষ্ট্রীয় শাস্তির আওতায় থেকেও শিল্প চালুর আগ্রহ দেখায়, তবে ক্ষেত্রবিশেষে সেই শাস্তি শিথিল করা যেতে পারে। কারণ অর্থনীতির স্বার্থে এ ধরনের সিদ্ধান্ত অনেক সময় প্রয়োজন হয়। শাস্তি তো ফাঁসির চেয়ে বড় নয়, কিন্তু কয়েকশ শিল্পোদ্যোক্তাকে কারাগারে রাখলে যদি লাখ লাখ শ্রমিকের চাকরি হারাতে হয় এবং জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তবে সেই শাস্তির মূল্য কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্ন উঠবেই।
অতএব, অর্থনীতিকে সর্বাগ্রে স্থান দিতে হবে। দেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত নয়, তা নৈতিকতার মানদণ্ডে যতই যুক্তিসঙ্গত মনে হোক না কেন। ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্র অনেক সময় অর্থনীতির স্বার্থে অপ্রচলিত বা কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না?
জুলাই বিপ্লব মানুষকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি দিয়েছে। তবে অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে বড় সংকট। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে, ডলারের দাম উঠেছে। শত শত ব্যবসায়ী আত্মগোপনে যাওয়ায় কল-কারখানা বন্ধ হয়ে লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। অভ্যন্তরীণ খাতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে। বিদেশি ব্যাংক লেনদেন কমাচ্ছে, ক্রেডিট রেটিং নেমে গেছে। ফলে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ছে এবং ব্যাংক-রানের মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ উদ্যোগ জরুরি। বন্ধ শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু করতে মালিকদের ফেরানো এবং প্রয়োজন হলে বিশেষ সুবিধা দেয়া এখন সময়ের দাবি।

