চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো বা ব্রহ্মপুত্র নদে নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতের নিয়িংচি শহরের কাছে মাইনলিং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ‘গ্রাউন্ড ব্রেকিং’ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। ১৬৭.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রকল্পে পাঁচটি কেসকেড জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। প্রাথমিকভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হবে। একইসঙ্গে, স্থানীয় বিদ্যুৎ চাহিদাও পূরণ হবে।
বলা বাহুল্য নয়, সাংপো বা ব্রহ্মপুত্রে চীনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে অনেকদিন ধরে আলোচনা চলছে। চীন এর আগেও ওই নদী অববাহিকায় আরও অন্তত চারটি ড্যাম নির্মাণ করেছে। এর মধ্যে প্রথম ২০১০ সালে জাংমু ড্যামের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ২০১৫ সালে নির্মিত হয় জাম ড্যাম। ২০২০ সালের পর নির্মাণ সম্পন্ন করে আরও দুটি ড্যাম, দাগু ও জাইচা। নতুন যে প্রকল্প উদ্বোধন হলো, সেটিতে অন্তত তিনটি দিক বিশেষভাবে বিবেচ্য।
প্রথমত, এই প্রকল্পের তুলনায় সাংপোর আগের চারটি ড্যাম নস্যিও নয়। যদিও যথাযথ চিত্র পাওয়া কঠিন, একটি হিসাবে ওই চার ড্যামের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা কমবেশি ৫০০ মেগাওয়াট। চীনের ও বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা কমবেশি ১৭ হাজার মেগাওয়াট। নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটির সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা হবে ৬০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। যেমন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (প্রকৃত উৎপাদন নয়) কমবেশি ২৫ হাজার মেগাওয়াট। তার মানে, গোটা বাংলাদেশে আমরা যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করি, চীনের এই একটি প্রকল্প থেকে তার দ্বিগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। যে কারণে এটিকে বলা হচ্ছে ‘মাদার অব অল ড্যামস’।

দ্বিতীয়ত, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে এমন একটি নদীতে যেটি সাংপো, সিয়াং, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নামে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এছাড়া ভুটান থেকে আসা কিছু উপনদী এই অববাহিকার অংশ। অর্থ্যাৎ, মেকংয়ের কথা বাদ দিলে এশিয়ার মধ্যে এই নদী অববাহিকায় দেশের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু মেকংয়ে যেভাবে অববাহিকার প্রায় সব দেশ মিলে জলবিদ্যুৎসহ অন্যান্য সুফল ভাগাভাগি করছে, সাংপো বা ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে তার ছিটেফোঁটাও নেই। বস্তুত, এই প্রকল্প সম্পর্কে কোনো তথ্য ভাটির দেশ ভারত, বাংলাদেশ ও ভুটানকে জানায়নি চীন। বরং পারতপক্ষে তথ্য লুকিয়ে রাখতে চেয়েছে। যেমন, রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা শিনহুয়ার সংবাদটিতে শুধু উদ্বোধনের খবর দেওয়া হয়েছে; বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। অথচ, অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, এই প্রকল্পের একটি বড় অংশ হচ্ছে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল বা সুড়ঙ্গ। প্রকৌশলীরা ওই অনুষ্ঠানে বলেছেন, কেবল জলবিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; নামচা-বারওয়া পর্বত ফুটা করে যাওয়া এই টানেল দিয়ে পানিও প্রত্যাহার করে নিয়ে যাওয়া হবে চীনেরই শুকনো অঞ্চলে (বিবিসি নিউজ, ২১ জুলাই ২০২৫)।
তৃতীয়ত, ভারতের দিক থেকে দেখলে, চীনের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে সীমান্তের থেকে সবচেয়ে কাছে। গুগল ম্যাপে মোটাদাগে হিসাব করে দেখেছি, তা তিব্বত-অরুণাচল সীমান্ত থেকে ৫০-৬০ কিলোমিটারের বেশি নয়। ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ছাড়াও ড্যামটি যেহেতু নিম্ন সাংপোর বৃষ্টিপাত অঞ্চলে নির্মিত হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্রের ‘সিয়াং’ বা অরুণাচল অংশের পানিপ্রবাহে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে। প্রসঙ্গত, তিব্বতে সাংপো অববাহিকার বেশির ভাগই বৃষ্টিহীন অঞ্চল। সেখানকার নদীগুলোর উৎস মূলত তুষার, বরফ ও হিমবাহ গলা পানি। এ ছাড়া পাবর্ত্য অঞ্চলে নির্মিত এই বিশাল স্থাপনার কারণে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকির যে প্রশ্নটি রয়েছে, সেটি চীন ছাড়াও ভারতকে প্রভাবিত করবে।

উপরোক্ত তিনটি বিশেষ বিবেচনায় প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকল্পটি বাংলাদেশের জন্য কতখানি শঙ্কার আর কতখানি সুযোগের। মূলত তথ্যের ঘাটতিতে, এতদিন আমরা বলে এসেছি যে চীনা ড্যাম নিয়ে বাংলাদেশের শঙ্কার সুযোগ কম। কারণ, ফারাক্কা বা তিস্তা ব্যারাজের মতো চীনা ড্যামগুলো পানি প্রত্যাহার করবে না। বরং প্রবাহের চক্রায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। ব্রহ্মপুত্রের মধ্য দিয়ে যে পানি আমরা বাংলাদেশে পাই, সেটির বিপুল অংশ, ৮৫-৯০ ভাগ আসে অরুণাচল ও আসামের বৃষ্টিবহুল অঞ্চল থেকে। আবার ড্যামে প্রবাহ চক্রায়নের মধ্য দিয়ে সিল্টেশন বা তলানিপ্রবাহের যে ঘাটতি দেখা দেয়, সেটিও ভারতে যতখানি প্রভাব ফেলবে, সুদূর বাংলাদেশে ততখানি নয়।
এমনকি চীনা ড্যাম থেকে আকস্মিক পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে ভারতে যে বন্যা দেখা দিতে পারে, সেটির উদ্বেগও কম। ২০১৭ সালের আগস্টে ‘দ্য হেগ ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল জাস্টিস’ থেকে প্রকাশিত ‘ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটার কো-অপারেশন ওভার দ্য ব্রহ্মপুত্র রিভার: লিগ্যাল, পলিটিক্যাল ইকোনমি অ্যানালাইসিস অব কারেন্ট অ্যান্ড ফিউচার পটেনশিয়াল কো-অপারেশন’ শীর্ষক সমীক্ষাতে বাংলাদেশি একজন বিশেষজ্ঞ হিসাব কষে দেখিয়েছিলেন, তিব্বত থেকে ছেড়ে দেওয়া ১০ ফুট উচ্চতার প্রবাহ বাংলাদেশ পৌঁছতে পৌঁছতে ৩ ইঞ্চিতে নেমে আসতে পারে। এখন দেখা যাচ্ছে, চীনের প্রকল্পটি পানি প্রত্যাহারও করবে। তার মানে, ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
দ্বিতীয় শঙ্কাটি হচ্ছে, ভারত ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে যে, চীনা ড্যামের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তারা অরুণাচলে ব্রহ্মপুত্রের সিয়াং অংশে একাধিক ড্যাম ও জলাধার নির্মাণ করবে। যাতে করে, চীন যে পানি আটকিয়ে রাখবে, সেটি সামাল দেওয়া যায়। এছাড়া আকস্মিকভাবে পানি ছেড়ে দিলে যেন সেটিও জলাধারে ধরে রাখা যায়। ফলে, চীনা প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় ড্যামের কারণে বাংলাদেশের ভাগে দ্বিগুণ ঘাটতি যোগ হবে। আমরা জানি, সীমান্তের বাইরে থেকে যে প্রবাহ বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তার ৬৫ শতাংশই আসে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে (সিএনএ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড সল্যুশন, ২০১৬, ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র)। ব্রহ্মপুত্র যেহেতু বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ আন্তঃসীমান্ত নদী। সেটিতে ঘাটটি মানে দেশের নৌ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, সেচ, পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থায় গুরুতর প্রভাব পড়বে। এ বিষয়ে আগ্রহীরা পড়তে পারেন আমার সাম্প্রতিক নিবন্ধ ‘চীন-ভারতের পানি অস্ত্র এবং বাংলাদেশের করণীয়’ (সমকাল, ২০ অক্টোবর ২০২৪)।
স্বাভাবিকভাবেই, ভারত চাইছে চীনা প্রকল্পটি নিয়ে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অপর দুই দেশ বাংলাদেশ ও ভুটানও সোচ্চার হোক। গত বছর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত দিল্লির দিক থেকে একাধিকবার ঢাকার দরজায় কড়া নাড়া হয়েছিল; যাতে করে দুই ‘ভাটির দেশ’ একসঙ্গে বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। এখন কী পরিস্থিতি জানি না; কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের জন্য সুযোগ রয়েছে। ঢাকা দিল্লিকে বলতে পারে যে, কেবল ব্রহ্মপুত্র নয়; গঙ্গা, তিস্তা, বরাকসহ অভিন্ন সব নদীর ক্ষেত্রেই আমরা এভাবে অববাহিকার সকল দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলি। ব্রহ্মপুত্র নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের শঙ্কার মধ্যে এটিই সম্ভবত একমাত্র সুযোগও।
আর, ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় অবস্থান হওয়া উচিত–আন্তর্জাতিক আইন ও রেওয়াজ মেনে নদীটিতে অববাহিকার সব দেশের সমান সুযোগ থাকতে হবে। মেকং কমিশনের মতো ব্রহ্মপুত্র কমিশন গঠন করা গেলে সবচেয়ে ভালো হয়। সূত্র: সমকাল

