দেশে নগদ অর্থের চাহিদা প্রতিবছর প্রায় ১০ শতাংশ করে বাড়ছে। এ চাহিদা মেটাতে গিয়ে টাকা ছাপানো, বিতরণ ও নষ্ট করার পেছনে বছরে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ সামিট ২০২৫’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এ তথ্য জানান। ইনস্টিটিউট অব কস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) ও মাস্টারকার্ডের যৌথ উদ্যোগে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘দ্য ইন্টারসেকশন অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড টেকনোলজি’।
গভর্নর বলেন, আমরা নগদবিহীন সমাজের দিকে যাচ্ছি। এটি একটি যৌথ যাত্রা। আগামী ১০ বছরে রাজস্ব সংগ্রহ থেকে শুরু করে ব্যাংক সেবা, বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন—সবকিছুই ধীরে ধীরে ডিজিটাল ব্যবস্থায় আসবে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রতি বছর ক্যাশের চাহিদা ১০ শতাংশ করে বাড়ছে। ডিজিটালাইজেশন হলেও নগদের ব্যবহার কমছে না। যদি এ ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে অর্জন কী হলো।
তিনি জানান, নগদ ছাপানো ও বিতরণে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এজন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ক্যাশ ব্যবহারের প্রবণতা কমানো জরুরি। এজন্য ইন্টারঅপারেবল ব্যবস্থা গড়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বিল গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং মোজোলোক নামের একটি সিস্টেম বাংলাদেশে চালুর প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি কিউআর কোডকে জাতীয় পর্যায়ে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। ট্রেড লাইসেন্সধারী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
মোবাইল আর্থিক সেবা প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, এ খাতে প্রতিযোগিতা ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এজন্য ‘নগদ’কে বেসরকারি খাতে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হবে এবং তিন থেকে চার মাসের মধ্যে নতুন বিনিয়োগকারী পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে উঠলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার। কর সংগ্রহ সহজ হবে এবং ট্যাক্স লিকেজ বন্ধ হবে। তিনি জানান, শতভাগ ডিজিটাল লেনদেন করা কোম্পানিগুলোকে আড়াই শতাংশ কর ছাড় দেয়া হচ্ছে। যারা ডিজিটাল লেনদেনে যাচ্ছে না তাদের অতিরিক্ত কর দিতে হচ্ছে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে ‘ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনে ফিনটেকের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের পরিচালক মো. শরাফত উল্লাহ খান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, বিকাশ লিমিটেডের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহমেদ, মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের পরিচালক জাকিয়া সুলতানা এবং সেবা প্লাটফর্মের চেয়ারম্যান আদনান ইমতিয়াজ হালিম।
সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘রেগুলেটরি রিফর্মস ও পলিসি রোডম্যাপ ফর আ ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, শ্বেতপত্র ও টাস্কফোর্সে এ নিয়ে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে এখন সরকারের ইশতেহারেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরো বলেন, নগদবিহীন অর্থনীতি কার্যকর করতে একটি উচ্চ কাঠামো গঠন জরুরি। পরিকল্পনা কমিশনকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে অগ্রগতি তদারকি ও মূল্যায়ন করতে হবে।
এ অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নেন অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান, সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন এবং দ্য লিগ্যাল সার্কেলের প্রতিষ্ঠাতা অনিতা গাজী রহমান। অনুষ্ঠানে আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল এবং আইসিএমএবির সভাপতি মাহতাব উদ্দিন আহমেদও বক্তব্য দেন।

