দীর্ঘদিন ধরে পণ্যে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে দেশের রফতানি আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু বাস্তবে এই উদ্যোগগুলো তেমন কার্যকর হয়নি। বরং হিমায়িত খাদ্য, পাট ও চামড়া খাতের রফতানি অবদান ক্রমেই কমছে। এর বিপরীতে তৈরি পোশাক খাত রফতানিতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে। এই খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে দেশের রফতানি আয় বৃদ্ধি পেলেও অর্থনীতিতে ঝুঁকি বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একক খাতের ওপর রফতানি আয় কেন্দ্রীভূত হওয়ায় এটি ভূ-অর্থনৈতিক চাপের জন্ম দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ট্যারিফ ইস্যুতে দরকষাকষির সময় এই সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক রফতানির প্রধান গন্তব্য হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। এই বাজারে প্রধান দেশগুলো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার কৌশল হিসেবে বাংলাদেশের এই নির্ভরতাকে ব্যবহার করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পর শ্রম অধিকার ও কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ বেড়েছে। পশ্চিমা ক্রেতারা তখন বাংলাদেশকে শ্রমমান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন শর্ত দিয়েছে। ফলে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নির্ভর এই শিল্পে বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক চাপ, শ্রম অধিকার ও মানবাধিকারের অজুহাতে হস্তক্ষেপের ঘটনা দেখা গেছে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। এই সুবিধা পেতে শুধু অর্থনৈতিক শর্ত নয়, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংক্রান্ত শর্তও মানতে হয়। ফলে অনেক সময় পোশাক শিল্পকে ঘিরে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য কূটনৈতিক চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চীন বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগকারী এবং কাপড়-সুতা সরবরাহ করে। বিপরীতে, পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান ক্রেতা। এই বিপরীতমুখী সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশকে চীন ও পশ্চিমা শক্তির মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ আর আগের মতো শুল্ক সুবিধা পাবে না। তখন ভূ-অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সবুজ জ্বালানি ব্যবহার এবং টেকসই উৎপাদনও এখন ভূরাজনৈতিক শর্তের অংশ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন, অনেক দেশ বুঝে গেছে যে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে আঘাত করলে অনেক কিছু আদায় করা সম্ভব। অর্থাৎ পোশাক খাত এখন ভূ-অর্থনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। কেউ চাইলে খাতকে অস্থির করে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর করতে পারে এবং দাবিও আদায় করা সহজ হয়। দীর্ঘদিন ধরে সরকার পণ্যে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে রফতানি আয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তবে বাস্তবে হিমায়িত খাদ্য, পাট ও চামড়া খাতের অবদান ক্রমেই কমছে। এর বিপরীতে তৈরি পোশাক খাত রফতানিতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে। এই খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে দেশের রফতানি আয় বেড়েছে, কিন্তু অর্থনীতিতে ঝুঁকি ও ভূ-অর্থনৈতিক চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ আর আগের মতো শুল্ক সুবিধা পাবে না। তখন ভূ-অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তন, সবুজ জ্বালানি ব্যবহার এবং টেকসই উৎপাদনও এখন ভূরাজনৈতিক শর্ত হিসেবে ধরা হচ্ছে। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশের পোশাক খাত এখন ভূ-অর্থনৈতিক অস্ত্র। কেউ চাইলে খাতকে অস্থির করে অর্থনীতি ভঙ্গুর করতে পারে এবং দাবিও আদায় করা সহজ হয়।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “আজকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আইএলও আমাদের বাণিজ্য সুবিধাকে পুঁজি করে যেসব শর্ত মানতে চাপ দিচ্ছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন ২০ জন সদস্য হলেই ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে, এটা চরম আপত্তিকর। এসব শর্ত মোকাবেলা করে শিল্প এগিয়ে যেতে পারবে না। অন্যদিকে ভারত বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে আমাদের মার্কেট দখলের চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশে নীতিনির্ধারকরা খাতের সুবিধা প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। এ কারণে আমরা চাপে পড়ে যাচ্ছি।”
একসময় বাংলাদেশ শুধু পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি করত। মোট রফতানি আয়ের ৯৭ শতাংশই আসত এ খাত থেকে। তখন পাটকে ‘সোনালি আঁশ’ বলা হতো। কিন্তু কালের পরিক্রমায় পাটের অবস্থান হারিয়ে গেছে। তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘকাল ধরে রফতানিতে প্রাধান্য নিয়েছে। সত্তরের দশকে তৈরি পোশাক রফতানি শুরু হলেও বিকাশ হয়েছে পরবর্তী দশকগুলোতে। এ সময়ে অন্যান্য খাতের অবদান কমার বিপরীতে পোশাক খাতের হিস্যা ক্রমেই বেড়েছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের খাতভিত্তিক রফতানি আয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাত রফতানিতে প্রধান অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০০০ থেকে ২০০৫ সময়কালে বার্ষিক গড়ে ৫০২ কোটি ৫০ লাখ ডলার তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছিল। এই সময়ে মোট রফতানিতে খাতটির অবদান ছিল ৭৫.২ শতাংশ।
এর পরের দশকে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সময়ে বার্ষিক গড় রফতানি বেড়ে ৩ হাজার ৬৬২ কোটি ৯০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। এ সময়ে রফতানিতে পোশাক খাতের হিস্যা বেড়ে ৮৩ শতাংশে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওভেন ও নিট মিলিয়ে ৩ হাজার ৯৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে। এই সময়ে মোট রফতানিতে খাতটির অবদান ছিল ৮১.৪৯ শতাংশ। ডলারের হিসাবে রফতানি বেড়লেও চামড়া ও জুতার খাতের অবদান কমেছে। ২০০০ থেকে ২০০৫ সময়কালে এ খাতে বার্ষিক গড়ে ২৪ কোটি ১০ লাখ ডলার রফতানি হয়েছিল। খাতটির মোট রফতানিতে অবদান ছিল ৩.৬ শতাংশ। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালে খাতের অবদান কমে ১.১ শতাংশে দাঁড়ায়। এই সময়ে বার্ষিক গড়ে রফতানি হয়েছে ৪৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চামড়া ও জুতা রফতানি বেড়ে ১১৪ কোটি ৫১ লাখ ডলার হলেও, মোট রফতানিতে অবদান মাত্র ২.৩৭ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু একক খাতের ওপর কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি ও ভূ-অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে। অন্যদিকে চামড়া-জুতার মতো খাতগুলোতে অবদান কমায় বৈচিত্র্যময় রফতানি গঠন সুরক্ষিত রাখতে নতুন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রফতানি পরিস্থিতি ও পণ্যে নির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সহসভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, “ভূরাজনৈতিক চাপের শিকার না হতে চাইলে আমাদের তৈরি হওয়া দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। একটি খাত তৈরি করতে বহু বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল লাগে। এটা গত ৩০-৪০ বছরে হয়েছে। এজন্য একটি খাতে সবসময় প্রবৃদ্ধি থাকে। অন্য খাতগুলোতে সরকার তেমন মনোযোগ দেয়নি, ব্যবসায়ীরাও বিনিয়োগ করেননি। বৈচিত্র্য আনতে ব্যর্থতা বা ভূরাজনৈতিক চাপ থাকলেও, এটা আমাদের নিজেরই দায়িত্ব।”
রফতানিতে হিমায়িত খাদ্য একসময় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ২০০০ থেকে ২০০৫ সময়ে বার্ষিক গড়ে ৩৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের রফতানি হয়। এ সময়ে মোট রফতানির ৫.২ শতাংশই ছিল হিমায়িত খাদ্যের দখলে। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালে বার্ষিক গড় রফতানি বেড়ে ৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছলেও, রফতানিতে খাতটির অবদান কমে ১.১ শতাংশে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রফতানি হয়েছে ৪৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার, যা মোট রফতানির মাত্র ০.৯১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমায়িত খাদ্য খাতের অবদান কমায় বাংলাদেশের রফতানি বৈচিত্র্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একক খাতের ওপর নির্ভরতা অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, আর ভূ-অর্থনৈতিক চাপ আরও প্রবল হচ্ছে।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের রফতানিতে তৈরি পোশাক খাত প্রাধান্য বজায় রেখেছে। ২০০০ থেকে ২০০৫ সময়কালে বার্ষিক গড়ে ৫০২ কোটি ৫০ লাখ ডলার তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছিল, যা মোট রফতানির ৭৫.২ শতাংশ। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সময়ে খাতের বার্ষিক গড় রফতানি বেড়ে ৩ হাজার ৬৬২ কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং হিস্যা বেড়ে ৮৩ শতাংশে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওভেন ও নিট মিলিয়ে ৩ হাজার ৯৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার রফতানি হয়েছে, মোট রফতানিতে অবদান ৮১.৪৯ শতাংশ।
চামড়া ও জুতার খাতের অবদান কমেছে। ২০০০-২০০৫ সময়ে বার্ষিক গড়ে ২৪ কোটি ১০ লাখ ডলার রফতানি হতো, মোট রফতানিতে ৩.৬ শতাংশ। ২০১৮-২০২৩ সালে খাতের অবদান কমে ১.১ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ সালে রফতানি বেড়ে ১১৪ কোটি ৫১ লাখ ডলার হলেও, মোট রফতানিতে অবদান মাত্র ২.৩৭ শতাংশ। হিমায়িত খাদ্য খাতও কম গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। ২০০০-২০০৫ সালে বার্ষিক গড়ে ৩৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার রফতানি, মোট রফতানির ৫.২ শতাংশ। ২০১৮-২০২৩ সালে বার্ষিক গড়ে ৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার হলেও, অবদান ১.১ শতাংশ। ২০২৪-২৫ সালে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রফতানি ৪৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার, মোট রফতানিতে অবদান মাত্র ০.৯১ শতাংশ।
প্রকৌশল পণ্যের রফতানি বৃদ্ধির দেখা গেলেও মোট রফতানিতে খাতের অবদান কম। ২০০০-২০০৫ সালে বার্ষিক গড়ে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার, ২০২৪-২৫ সালে ৫৩ কোটি ৫৬ লাখ ডলার, মোট রফতানিতে অবদান ১.২ শতাংশ। কৃষিপণ্য রফতানিও উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। ২০০০-২০০৫ সালে বার্ষিক গড়ে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২০১৮-২০২৩ সালে ৪৮ কোটি ২০ লাখ ডলার, সর্বশেষ ২০২৪-২৫ সালে ১০০ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। মোট রফতানিতে অবদান এখন ২.০৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের রফতানি বাজারও সীমিত। ২০২৪-২৫ সালে মাত্র চারটি বাজার থেকে মোট রফতানির ৬৮.২৫ শতাংশ এসেছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২ হাজার ১৩৮ কোটি ৪২ লাখ ডলার (৪৪.২৯%), যুক্তরাষ্ট্র ৮৬৯ কোটি ২৪ লাখ ডলার (১৮%), কানাডা ১৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ডলার (৩.০৩%) এবং জাপান ১৪১ কোটি ১৬ লাখ ডলার (২.৯২%)। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা অর্থনীতিতে দ্রুত বৃদ্ধি এনেছে, কিন্তু একক খাতের ওপর কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ঝুঁকি ও ভূ-অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। চামড়া-জুতা, হিমায়িত খাদ্য, কৃষি ও প্রকৌশল খাতগুলোতে অবদান কমায় বৈচিত্র্যময় রফতানি গঠন সুরক্ষিত রাখতে নতুন উদ্যোগ অপরিহার্য।
একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে—৪৯৪ কোটি ৯৪ লাখ ডলারের ওভেন পোশাক, ২৫৯ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের নিট পোশাক, ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল, ২৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের ক্যাপ এবং ২ কোটি ৮ লাখ ডলারের ক্রাস্টেসিয়ানস। মোট রফতানি হিসাব করলে দেখা যায়, ওভেন পোশাকের ২৭.২১ শতাংশ, নিট পোশাকের ১২.২৭ শতাংশ এবং হোম টেক্সটাইলের ১৪.৯৯ শতাংশ গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একক বাজার হিসেবে প্রাধান্য বাংলাদেশের জন্য ভূ-অর্থনৈতিক জটিলতার অংশ। রেমিট্যান্স ও রফতানি দেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস। তৈরি পোশাক খাত শুধু বৈদেশিক মুদ্রা নয়, স্থানীয় কর্মসংস্থানেরও বড় উৎস। তাই খাতের ওপর কোনো আঘাত অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। বর্তমান জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক শক্তিগুলো বাংলাদেশের এই দুর্বলতার বিষয়টি বুঝে নিয়েছে। ফলে বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক স্বার্থের ইস্যু ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ওপর বড় অংকের শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। পাশাপাশি সয়াবিন বীজ, ভুট্টা, গম, এলপিজি আমদানি এবং বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে। এর প্রভাবে ঘোষিত শুল্কের হার কমিয়ে ৩৫ থেকে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। ফলে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।
ভৈষম্যহীন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ১২ সদস্যবিশিষ্ট একটি টাস্কফোর্স গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদকে টাস্কফোর্সের প্রধান করা হয়। তাদের প্রতিবেদনে গত দুই দশকে খাতভিত্তিক পণ্য রফতানির তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও রফতানি বৈচিত্র্যকরণের সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। টাস্কফোর্স সুপারিশ করেছে—
- তৈরি পোশাক খাতের পণ্যে আরও মূল্য সংযোজন ও নতুন উপাদান ব্যবহার করে বৈচিত্র্য আনা।
- তৈরি পোশাকবহির্ভূত শ্রমঘন খাতের উৎপাদন ও রফতানি বৃদ্ধি করা।
- জটিল ও দক্ষতাভিত্তিক পণ্য ও সেবার উৎপাদন বাড়ানো।
ড. কেএএস মুরশিদ বলেন, “রফতানি বাজারে পোশাককেন্দ্রিক সাফল্যের সঙ্গে একটি অন্তর্নিহিত ঝুঁকি সবসময় থেকেই গেছে। ইন্ডাস্ট্রি কনসেনট্রেশন ও কান্ট্রি স্পেসিফিক কনসেনট্রেশনের কারণে ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়েছে। আমরা কোনো এক দেশের, বিশেষ করে পরাশক্তির ওপর এতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, তাদের বাজারকে পলিসি টুল হিসেবে ব্যবহার করে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এটি বিপরীত। আমাদের এ ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনা করে বৈচিত্র্য আনা অত্যাবশ্যক।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের রফতানি এবং অর্থনীতিকে ভূ-অর্থনৈতিক চাপে ফেলেছে। বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগ ছাড়া খাতটি দ্রুত আঘাতপ্রবণ হয়ে যাবে, যা দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত শুল্কের হার ২০ শতাংশ হওয়াকে ড. কেএএস মুরশিদ অনেকটা ‘সৌভাগ্য’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “যদি ভারতের মতো ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতো, তাহলে পুরো দেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ত। এখান থেকে অবশ্যই শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। বেসরকারি খাতকেও বোঝা উচিত ছিল, একটি শিল্পের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার প্রভাব কী হতে পারে। স্বল্পমেয়াদি ভাবনা—তাৎক্ষণিক লাভ এবং পালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা—এটাই মূল সমস্যা। আমরা রাজনৈতিকভাবে একটি দেশের, বাণিজ্যিকভাবে আরেকটি দেশের এবং শিল্পগতভাবে একটি আইটেমের ওপর নির্ভর করেছি। এটি এক ধরনের ফুলিশ পলিসি। দ্রুত এখান থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।”
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “এই পরিস্থিতি যদি ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে, তা সচেতনভাবে হয়নি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নয়। মূল সমস্যা হলো রফতানি পণ্য বৈচিত্র্যকরণের অভাব। অন্য খাতগুলোকে শক্তিশালী করা হয়নি। আগে পাট ছিল, এরপর লেদার সেক্টর এগিয়ে গেল কিন্তু পরে পিছিয়ে পড়ল। বড় হতে না পারলে অন্যরা ছোট হয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই।”
তিনি আরো বলেন, “এ পরিস্থিতিকে ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হতে দেয়া যাবে না। যুদ্ধ বা দরকষাকষি আরও শক্তিশালী হতো যদি আমাদের এক্সপোর্ট বাস্কেট বৈচিত্র্যপূর্ণ হতো। তাহলে আমরা শক্তভাবে লড়তে পারতাম, যেমন ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া বা ভারত করেছে। আমাদের অবশ্যই রফতানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে, নইলে ভবিষ্যৎ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতির্ভরতা বাংলাদেশের রফতানি ও অর্থনীতিকে ভূ-অর্থনৈতিক চাপে ফেলেছে। বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগ ছাড়া দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে থাকবে।
বাংলাদেশের রফতানি খাত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত। এটি দেশের বৈদেশিক আয় ও কর্মসংস্থানের বড় উৎস হলেও, একক খাত ও নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতির্ভরতা অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। শুল্ক, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ভূ-রাজনৈতিক চাপের প্রভাবে এই ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রফতানিতে বৈচিত্র্য আনাই একমাত্র সমাধান। তৈরি পোশাক খাতের পণ্যে মূল্য সংযোজন, নতুন উপাদান ব্যবহার, শ্রমঘন ও দক্ষতাভিত্তিক অন্যান্য খাতের উন্নয়ন এবং বৈচিত্র্যমূলক বাজার সম্প্রসারণ ছাড়া ভবিষ্যতে দেশের রফতানি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এখনই বৈচিত্র্যকরণের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

