রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চার বছরের স্নাতক কোর্স সম্পন্ন করেছেন আবু সুফিয়ান। ২০২০ সালে তিনি পড়ালেখা শেষ করলেও পছন্দমতো সরকারি চাকরি পাননি। বর্তমানে দেশীয় একটি অটোমোবাইল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তিনি। তবে যে বেতন পান, তাতে সন্তুষ্ট নন। তার লক্ষ্য এখনও সরকারি চাকরি।
দশম গ্রেডের কোনো পদই তার জন্য সম্ভাব্য লক্ষ্য। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নিয়ে দশম গ্রেডে চাকরিতে প্রবেশ খুবই সীমিত। সরকারি নিয়োগে এই গ্রেডের বেশির ভাগ পদ ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সংরক্ষিত। এ অবস্থা নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ। আবু সুফিয়ান বলছেন, “বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জব সিকিউরিটি নেই। জান-প্রাণ উজাড় করেও চাকরি হারানো যায়। সরকারি চাকরির সুযোগ খুবই কম। দশম গ্রেডে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে অনেক জনবল প্রয়োজন। কিন্তু তা সব ডিপ্লোমাধারীরা পাচ্ছে। এ একচেটিয়া প্রক্রিয়ায় বুয়েট-রুয়েট-চুয়েট-কুয়েট থেকে পড়া অনেকেই বেকার হয়ে যাচ্ছে।”
এ পরিস্থিতি শুধু বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নয়। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ চিত্র লক্ষ্য করা যায়। হাতে-কলমে শিক্ষা নিয়ে ওদেরও চাকরি সহজে পাওয়া যায় না। তারা প্রশ্ন করে, কেন কারিগরি শিক্ষা অর্জন করার পরও তারা বেকার থাকবেন। ডিপ্লোমাধারীরা বলছেন, “ডিপ্লোমা শেষে সরকারি চাকরির ক্ষেত্র বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থায় উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে রয়েছে। এই পদগুলো পুরোপুরি ডিপ্লোমাধারীদের জন্য রাখা উচিত। তা না হলে কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি বেকার থাকবে।”
শিক্ষাবিদরা মনে করান, দেশে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নেই। এই অভাবই মূলত বিএসসি ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও রেষারেষি তৈরি করছে। দীর্ঘদিন ধরে কর্মসূচি ও পাল্টা কর্মসূচি চলে আসছে, কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি আরও লজ্জাজনক। তারা বলেন, দুই ধরনের ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
প্রকৌশলীদের দ্বন্দ্ব চরমে: বিএসসি ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি ও আন্দোলন
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করা আবু সুফিয়ান ও অন্যান্য বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরি পেতে আন্দোলন করছেন। মূলত বুয়েটের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন। সম্প্রতি তারা রাতে কয়েক দফা বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন শাহবাগ এবং রাজু ভাস্কর্য এলাকায়। সরকারের প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় গতকাল মঙ্গলবার শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। প্রথম দিনে আলটিমেটাম দিয়ে ফিরে গেলেও, আজ বুধবার আবারো মোড় অবরোধ করেন। পরে মিছিল নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

অন্যদিকে, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইডিইবি)। তারা ঢাকার সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিকসহ দেশের সব পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করে ৭ দফা দাবিতে আন্দোলন চালাচ্ছেন। চলতি বছরের শুরু থেকেই তারা গাজীপুরসহ দেশের সব পলিটেকনিকে টানা বিক্ষোভ ও সমাবেশ করছেন।
দুই পক্ষের অবস্থানের চাপের মধ্যে আজ সরকার চারজন উপদেষ্টার সমন্বয়ে ৮ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। কমিটির সভাপতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, “দুই দিক থেকে দাবি এসেছে। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি একরকম, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি অন্যরকম। সব পক্ষের কথা শুনে ন্যায্য সমাধান করা হবে।” এ আন্দোলন উভয় পক্ষের জন্য কর্মসংস্থানের সংকট এবং পদসংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিনের হতাশা প্রকাশ করছে। বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা দশম গ্রেডে সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা তাঁদের স্বীকৃত এবং সম্মানজনক চাকরির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষাবিদরা বলছেন, দুই পক্ষের জন্য ন্যায্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেই এই দ্বন্দ্বের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি:
দেশের চারটি প্রধান প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে—বুয়েট, রুয়েট, চুয়েট ও কুয়েট। এখানে চার বছরের বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রকৌশল অনুষদ রয়েছে, যেখানে অসংখ্য শিক্ষার্থী বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি নিচ্ছেন। তবে চাকরির বাস্তবতা তাদের জন্য হতাশাজনক। নবম গ্রেডে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরি পাওয়া যায় বিসিএসের মাধ্যমে—প্রিলি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে। ৩১ থেকে ৪৫তম বিসিএসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই সময়ে আটটি সাধারণ বিসিএসে সহকারী প্রকৌশলী পদ ছিল মাত্র ৪৬৮টি। অথচ প্রতি বছর চারটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় এক লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হয়। বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ থাকলেও সেখানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই। অনেক সময় কোনো কারণ ছাড়াই চাকরি চলে যায়। তাই সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকছেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররাও। এ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তারা তিন দফা দাবি তুলেছেন
- নবম গ্রেডে সহকারী প্রকৌশলী পদে কেবল পরীক্ষা ও ন্যূনতম যোগ্যতা অনুযায়ী বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়োগ।
- দশম গ্রেডে যে পদগুলো বর্তমানে শুধু ডিপ্লোমাধারীদের জন্য খোলা, সেখানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররাও আবেদন করতে পারবে।
- শুধুমাত্র বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা তাদের নামের সঙ্গে ‘প্রকৌশলী’ বা ‘ইঞ্জিনিয়ার’ লিখতে পারবে।
প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের সভাপতি এম ওয়ালীউল্লাহ বলেন, “বুয়েটে ভর্তির সুযোগ পান দেশের সর্বোচ্চ মেধাবী শিক্ষার্থীরা। রুয়েট, চুয়েট ও কুয়েটেও পরীক্ষা দিয়ে যারা ভর্তি হন এবং কোর্স শেষ করেন, তাদের সরকারি চাকরির পরীক্ষায় আবেদন করার সুযোগ কেন দেওয়া হচ্ছে না? উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে শুধুমাত্র ডিপ্লোমাধারীরা আবেদন করতে পারবে, আর সহকারী প্রকৌশলী পদেও ডিপ্লোমাধারীদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা হচ্ছে। তাহলে বুয়েট, রুয়েট, চুয়েট, কুয়েটের মেধাবীরা কোথায় যাবে?” এ আন্দোলন প্রকাশ করছে দেশের উচ্চশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মসংস্থান সংকট এবং স্বীকৃতির অভাব।
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ৭ দফা দাবি:
দেশের সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালানো হয়। এ প্রতিষ্ঠানে বছরে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এছাড়া পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) ভর্তির সুযোগ পান তারা। ফলে প্রতি বছর কয়েক লাখ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার চাকরির বাজারে প্রবেশ করে।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের শিক্ষাব্যবস্থা হাতে-কলমে শেখার ওপর বেশি জোর দেয়। তাই তারা সরকারি চাকরিতে সংরক্ষিত আসন বা কোটা এবং পদোন্নতির সুযোগের দাবিতে আন্দোলন করছেন। বর্তমানে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে শুধুমাত্র ডিপ্লোমাধারীরা আবেদন করতে পারেন। আন্দোলনকারীরা চান, এই সুবিধা বজায় থাকুক এবং সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ কোটা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নির্ধারণ করা হোক। এছাড়া আরও পাঁচটি দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন তারা।
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশ কারিগরি ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় নেতা আব্দুল আহাদ বলেন, “ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররাই প্রকৃত প্রকৌশলী। হাতে-কলমে আমরা দক্ষতা অর্জন করছি। চাকরির বাজারে আমাদের জন্য যথেষ্ট জায়গা না হলে দেশ এগোতে পারবে না। বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা তত্ত্বীয় বিষয় পড়ে কর্মক্ষেত্রে সুবিধা নিতে পারেন না। তারপরও তাদের জন্য সহকারী প্রকৌশলী পদ অনেকটা সংরক্ষিত। তাই আমাদের দাবি যৌক্তিক।” ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের এই আন্দোলন মূলত দক্ষ জনশক্তির স্বীকৃতি, চাকরির নিরাপত্তা ও পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে।
বিএসসি বনাম ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার:
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য সরকারি খাতে বিভিন্ন পদে চাকরির সুযোগ রয়েছে। প্রধান কিছু পদ হলো—গণপূর্ত অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী (নবম গ্রেড) ও সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার (দশম গ্রেড)। এছাড়া এলজিইডি, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পিডিবি, ডিপিডিসি, ডেসকো, নেসকো, পেট্রোবাংলা, রেলওয়ে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, ওয়াসা, সিভিল এভিয়েশন, শিক্ষা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, বিসিসি ও হাইটেক পার্কে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগের সুযোগ থাকে। এছাড়া সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার এবং প্রকৌশল কলেজে প্রভাষক পদেও নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্যও সরকারি খাতে বিভিন্ন পদ খোলা আছে। তারা উপ-সহকারী প্রকৌশলী (দশম গ্রেড) হিসেবে গণপূর্ত, এলজিইডি, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পিডিবি, ডেসকো, নেসকো, ডিপিডিসি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ওয়াসা, রেলওয়ে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, ক্যাব ও বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে পারেন। এছাড়া পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইনস্ট্রাক্টর/জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর পদে (দশম ও ১১তম গ্রেড) এবং সশস্ত্র বাহিনীতে বিভিন্ন টেকনিক্যাল পদে তাদের নিয়োগের সুযোগ আছে।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পেশাগত সংগঠন, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)-এর অন্তর্বর্তী আহ্বায়ক প্রকৌশলী মো. কবীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, “ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররাই মাঠে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন। আমাদের ৮ লাখ ইঞ্জিনিয়ার দেশের উন্নয়নে কাজ করছেন। অথচ বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সব খাত থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এটা মেনে নেওয়া হবে না।” এ পরিস্থিতি দুই প্রকার প্রকৌশলীর মধ্যে কর্মসংস্থান ও স্বীকৃতি নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিএসসি বনাম ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের রেষারেষির মূল কারণ:
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের মূল কারণ হলো চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতা। এর সঙ্গে ‘ইগো’ও বড় ভূমিকা রাখে। বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা ডিপ্লোমাধারীদের ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চান না। তারা চান তাদের ‘ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্ট’ হিসেবে সম্বোধন করা হোক। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পক্ষ থেকে দাবি, বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা শুধু তত্ত্বীয় বিষয় পড়েন। হাতে-কলমে কাজ শেখেন খুব কম। এজন্য বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে তুলনামূলক কম পারদর্শী হন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৌশল এমন একটি বিষয় যেখানে সব ধরনের দক্ষ প্রকৌশলীর প্রয়োজন। ভিন্ন ডিসিপ্লিনের প্রকৌশলীরা ভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শী হন। তাই কোনো একটি পদে শুধু ডিপ্লোমাধারী, অন্য পদে শুধু বিএসসি—এ নীতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। এজন্য সিলেবাস সংস্কারেরও প্রয়োজন রয়েছে।
বুয়েটের অবসরপ্রাপ্ত একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করে বলেন, “আমি ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের কিছু বলতে চাই না কিন্তু যারা দশম গ্রেডের চাকরির জন্য রাস্তায় নেমেছে, সেটা ভাবতেই অস্বস্তি হয়। তাদের কিছু দাবির সঙ্গে আমি একমত। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ শুধুমাত্র ডিপ্লোমাধারীদের জন্য বরাদ্দ করা অন্যায়।”

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “চাকরির বাজারের দিকে একটু নজর দিলে বোঝা যাবে, সবার দৃষ্টি সরকারি খাতের চাকরির দিকে। যথাযথ দক্ষতা না থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা পাস করলেই সরকারি চাকরি পাওয়া যায়। সবাই শর্টকাট পথ খুঁজছে। কেউ দক্ষ জনশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে না। ডিগ্রি নিয়েই নবম বা দশম গ্রেডের চাকরি খোঁজা আজকের এ দ্বন্দ্বের মূল কারণ।”
বিএসসি ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দ্বন্দ্ব মূলত চাকরির নিরাপত্তা, স্বীকৃতি ও ন্যায্য সুযোগের জন্য। সরকারি খাতে পদসংরক্ষণ ও কোটা, বেসরকারি খাতে চাকরির অনিশ্চয়তা, এবং শিক্ষাব্যবস্থার তত্ত্বীয় ও হাতে-কলমের ভিন্নতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দাবির দ্বন্দ্ব নয়, বরং সিলেবাস সংস্কার, দক্ষ জনশক্তির মূল্যায়ন ও ন্যায্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী সমাধান। দুই পক্ষের শিক্ষার্থী ও সরকারকে একসাথে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করতে হবে, তবেই দেশের প্রকৌশল ক্ষেত্রের মানবসম্পদ সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। সূত্র: সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।

