আগামী ডিসেম্বর বাংলাদেশ জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) করতে যাচ্ছে। এটি হবে দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। একই সঙ্গে সরকার ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যে আরো অন্তত চারটি দেশের সঙ্গে বিভিন্ন নামে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)-এ যোগ দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে সুবিধা পেতে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য সহজ হয় কিন্তু ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করলে এসব সুবিধা আর মিলবে না। সরকার ইতোমধ্যে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ ও ইপিএ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব চুক্তিতে শুধু রপ্তানিই নয়, বিনিয়োগ, সেবা এবং জনশক্তিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, “এলডিসি উত্তরণের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানসহ কিছু দেশ ও জোটের সঙ্গে ইপিএ, এফটিএসহ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরের আগেই কিছু দেশের সঙ্গে এসব চুক্তি করতে চাই।” তিনি আরও বলেন, “জাপানের সঙ্গে ইপিএ দরকষাকষির শেষ পর্যায়ে। ৩ সেপ্টেম্বর টোকিওতে শেষ দফার আলোচনায় আমি নিজে অংশ নেব। এরপর সরকারের নির্ধারিত সময়ে চুক্তি সম্পন্ন হবে। এছাড়া অন্যান্য দেশের সঙ্গেও দরকষাকষি চলছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রথম দফার আলোচনায় অংশ নিতে একটি প্রতিনিধি দল দেশটিতে অবস্থান করছে।”
এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ হোক, এমনটি ব্যবসায়ীরা চান। এতে শুল্কমুক্ত আমদানি-রপ্তানি সম্ভব হয়। আস্থা বাড়ে, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পাশাপাশি আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে চুক্তি করা প্রয়োজন।”
জাপানের সঙ্গে ইপিএর পাঁচ দফা দরকষাকষি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ইপিএ ও এফটিএ একই ধরনের হলেও ইপিএ আরও বিস্তৃত ও উন্নয়নবান্ধব। টোকিওতে ৩ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত দরকষাকষি হবে। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য সচিবসহ একটি প্রতিনিধি দল এতে থাকবে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের যৌথ স্টাডি গ্রুপের রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছিল। এতে বাণিজ্য, শুল্ক, বিনিয়োগ, ইলেকট্রনিক বাণিজ্যসহ ১৭টি খাতের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। গত ২৬ জুন দুই দেশের মধ্যে খাতভিত্তিক আলোচনাও শেষ হয়েছে। ২১টি ওয়ার্কিং গ্রুপ ৫৫টি সেশন করে পণ্য ও সেবাভিত্তিক আলোচনা সম্পন্ন করেছে। জাপান পুরো প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে এবং বাংলাদেশের পক্ষকে বিভিন্ন ছাড় দিয়েছে।
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ জাপানে তৈরি পোশাক শুল্কমুক্ত রপ্তানি করে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণ করলে ১৮ শতাংশের বেশি শুল্ক দিতে হবে। কিন্তু ইপিএ হলে শুল্ক বাড়বে না। চুক্তি বাস্তবায়িত হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আসবে এবং স্থানীয় শিল্প খাতে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বৃদ্ধি পাবে। গাড়ি ও তথ্য-প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। এছাড়া অন্যান্য দেশের সঙ্গে এফটিএ করা সহজ হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তি করতে চায়। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রথম দফার দরকষাকষিতে প্রতিনিধি দল দেশটিতে রয়েছে। সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে নেগোসিয়েশনও শুরু হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা মিলবে না, কিছু পণ্যে শুল্ক আগের মতো থাকবে। যেমন জাপানি গাড়িতে শুল্কমুক্ত সুবিধা নেই। শুল্ক কমানো বা বিলাসী পণ্যে শুল্ক আরোপের বিষয় চুক্তিতে নির্ধারিত থাকে। চীনের নেতৃত্বাধীন আরসিইপি-তে যোগ দিতে বাংলাদেশ প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে ১৫টি দেশ এবং ২৬.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার অন্তর্ভুক্ত। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি পাঁচ বিলিয়ন ডলার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া ও সৌদি আরবের সঙ্গে এফটিএ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিমসটেকের আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্যও এফটিএ আলোচনায় আছে। উল্লেখ্য, প্রতিবেশী ভুটানের সঙ্গে শুধু অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে পিটিএ বা এফটিএ এখনও হয়নি।

