চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি)–এর রাজস্ব আদায়ে। অক্টোবর মাস শেষ হতে না হতেই দেখা গেছে, লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশও পূরণ হয়নি। ফলে সরকারের আয় কমার পাশাপাশি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন আমদানিকারকেরা।
কাস্টম হাউস আইসিডি সূত্রে জানা গেছে, চলতি অক্টোবর মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৭৭ কোটি টাকা, কিন্তু ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ১৯০ কোটি টাকা। গত বছরের একই মাসে আদায় হয়েছিল ৪৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, রাজস্ব আদায়ে এবার বড় ধস নেমেছে।
এই ধসের মূল কারণ—চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় কনটেইনারবাহী ট্রেনের সংখ্যা হঠাৎ করে কমে যাওয়া। আগে প্রতিদিন অন্তত দুইটি কনটেইনার ট্রেন আসত ঢাকায়, এখন তা নেমে এসেছে একটিতে।
কাস্টমসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বন্দরে এখন শত শত কনটেইনার পড়ে আছে। ট্রেনের ইঞ্জিন সংকটের কারণে সেগুলো ঢাকায় আনা যাচ্ছে না। ফলে কমলাপুরে পণ্য না আসায় রাজস্ব আদায় “অস্বাভাবিকভাবে” কমে গেছে।
সংখ্যাগুলো আরও স্পষ্ট চিত্র দিচ্ছে:
চলতি অক্টোবরের ২৭ তারিখ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেন এসেছে ৩৮টি, যেখানে সেপ্টেম্বরে ছিল ৫৯টি এবং আগস্টে ৫৪টি। গত বছরের প্রথম দশ মাসে এসেছিল ৮০২টি ট্রেন, আর এ বছর একই সময়ে এসেছে মাত্র ৫৫৫টি।
এই ধীরগতির প্রভাব পড়ছে আমদানি–রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ায়। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, কনটেইনার পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বন্দরে এখন প্রায় ১,১৪২ টিইইউএস কনটেইনারের জট তৈরি হয়েছে। তাদের সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন বলেন, আগে প্রতিদিন দুই-তিনটি ট্রেন আসত, এখন একটিও ঠিকমতো আসে না। এতে বন্দরে কনটেইনারের পাহাড় জমেছে এবং রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফলাফল: ক্ষতির মুখে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, পরিবহন ঠিকাদার, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সবাই। কনটেইনার দেরিতে পৌঁছানোর কারণে তাদের অতিরিক্ত ডেমারেজ, ডিটেনশন ও হ্যান্ডলিং চার্জ দিতে হচ্ছে।
চীনা পণ্য আমদানিকারক আজাদ ট্রেডার্স–এর মালিক এ কে আজাদ বলেন,
“চীন থেকে পণ্য আনতে সময় লাগে ১৫ দিন, কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে কমলাপুর আনতে লাগে ২০ থেকে ২৫ দিন। এটা সত্যিই হতাশার। সময়মতো পণ্য না পৌঁছালে ক্রেতার চাহিদা মেটানো যায় না, ফলে লোকসান গুনতে হয়।”
তিনি আরও জানান, অনেক ব্যবসায়ী এখন ভাবছেন ভবিষ্যতে কমলাপুর আইসিডি বাদ দিয়ে অন্য কোনো পথে পণ্য খালাস করা যায় কি না।
বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর ও কমলাপুর আইসিডির মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দায়িত্বহীনতা ও ট্রেন পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা এই সমস্যার মূল কারণ। চীন থেকে জাহাজে কনটেইনার আসতে লাগে দুই সপ্তাহ, অথচ দেশের ভেতর এক বন্দরের পণ্য অন্য বন্দরে পৌঁছাতে লেগে যাচ্ছে প্রায় এক মাস—এটা বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য এক গভীর অচলাবস্থা ছাড়া কিছু নয়।

