রাজধানীর জনপ্রিয় গণপরিবহন এমআরটি লাইন-৬ দেশের প্রথম মেট্রোরেল। উদ্বোধনের পর থেকেই এটি নগর যাতায়াতে বড় স্বস্তি এনেছে। আধুনিক এই পরিবহন প্রতিদিন চার লাখের বেশি যাত্রী বহন করছে। জাতীয় বিশেষ দিনে সংখ্যা সাড়ে চার লাখ ছাড়ায়। কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত নির্মাণাধীন অংশ চালু হলে দৈনিক যাত্রী সংখ্যা দাঁড়াবে ৬ লাখ ৭৭ হাজার।
জনপ্রিয় হলেও মেট্রো-৬ নিয়ে ব্যয় সংক্রান্ত সমালোচনা রয়েছে। বলা হয়, এটি এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেট্রো প্রকল্প। ভারতের দিল্লি মেট্রোর তুলনায় ব্যয় দুই-তৃতীয়াংশ বেশি। পাকিস্তানের লাহোর মেট্রোরেলের চেয়ে দ্বিগুণ। এমনকি চীনের সাংহাইয়ের প্রথম মেট্রোর নির্মাণ ব্যয়ের পাঁচগুণ। এসব সমালোচনার পর মাঝ পথে এসে ব্যয় কমাচ্ছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) ৭৫৫ কোটি টাকা ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব একনেক বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বৈঠকটি আগামীকাল সোমবার হওয়ার কথা।
সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) পুনর্গঠন করা হয়। পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। কমিশন জানিয়েছে, ৭৫৫ কোটি টাকা ব্যয় কমানোর প্রস্তাব সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি অনুমোদনের জন্য বিবেচনাযোগ্য।
সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মতিঝিল স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান কাঠামোর জন্য বাড়তি ৩.৫৬ হেক্টর জমি আর লাগবে না। এতে সাশ্রয় হচ্ছে ১ হাজার ১২১ কোটি টাকা। চারটি স্টেশন প্লাজা নির্মাণও বাদ দেওয়া হয়েছে, যা থেকে সাশ্রয় হবে ১৬৫ কোটি টাকা। এগুলো উত্তরা উত্তর, উত্তরা মধ্য, আগারগাঁও ও মতিঝিল স্টেশনে করার কথা ছিল। এছাড়া মূল লাইন ও সিভিল কাজে ১১৬ কোটি টাকা, ইলেকট্রিক ও মেকানিক্যাল সিস্টেমে ৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং পুনর্বাসন পরামর্শ সেবায় প্রায় ৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
মেট্রোরেল-৬ (দক্ষিণ) প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল ওহাব জানান, বাদ দেওয়া স্টেশন প্লাজাগুলোর তেমন প্রয়োজন দেখা যায়নি। এসব প্লাজা ব্যাংক বুথ ও শপিং সুবিধা দিয়ে মেট্রোরেলের বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে ভাবা হয়েছিল। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এগুলো তেমন লাভজনক নয়। তাই বাদ দেওয়ায় ভূমি অধিগ্রহণ খরচ কমেছে। তিনি বলেন, বর্ধিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
তবে ব্যয় সাশ্রয় হলেও কিছু খাতে বাড়তি ব্যয় যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জাইকার ঋণের সুদ পরিশোধ, অতিরিক্ত সময়ের জন্য কর্মকর্তা ও পরামর্শকদের বেতনভাতা এবং মতিঝিল-কমলাপুর অংশে রোলিং স্টক অ্যান্ড ইকুইপমেন্টস ব্যয়। এসব মিলে বাড়তি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
ডিএমটিসিএল ব্যয় কমানোর পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। মতিঝিল-কমলাপুর ১.১৬ কিলোমিটার সম্প্রসারণের কাজ শেষ করতে এই সময় বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০.১ কিলোমিটার অংশ ইতোমধ্যে চালু আছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর উদ্বোধনের পর এটি প্রথমে উত্তরা-আগারগাঁও পর্যন্ত চলত। পরে ২০২৩ সালের শেষে মতিঝিল পর্যন্ত সব স্টেশন খুলে দেওয়া হয়। নতুন সংশোধনী অনুমোদন পেলে এটি হবে প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৩২ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা।

