ব্যবসায়ীরা অগ্রিম আয়কর ও উৎসে করের চাপ থেকে মুক্তি চাচ্ছেন। অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, “কর-সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে। ব্যবসায়ীরা লাভ করুক বা লোকসান করুক, সব অবস্থাতেই কর দিতে হচ্ছে। এমনও হয়েছে যে লোকসান বেশি, আবার করও বেশি দিতে হয়েছে।”
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কার্যালয়ে আয়োজিত বিনিয়োগ সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। ‘স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে বিনিয়োগ সংলাপ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিল্প খাতের অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ও বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, “ইতোমধ্যে এনবিআর বিভিন্ন সংস্কার করেছে। বন্ড অটোমেশন হয়েছে। এইচএস কোডের ‘সন্ত্রাস’ থেকে ব্যবসায়ীরা মুক্তি পেয়েছেন। এখন অগ্রিম কর ও উৎসে কর থেকে মুক্তি দরকার।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে শুধু ব্যবসায়ীরা নয়, আমলারা সবচেয়ে বেশি টাকা পাচার করেছেন। ব্যবসায়ীরা এ দায় নেবেন না। যারা টাকা বা গ্যাস চুরি করে, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। এ দায় যেন পুরো ব্যবসায়ী সমাজের ওপরে না আসে।”
ব্যবসায়ীদের উপর উচ্চ সুদহার চাপের বিষয়েও নাসিম মঞ্জুর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “উচ্চ সুদ ব্যবসায়ীরা বহন করতে পারছেন না। খরচ বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে টিকতে পারছি না। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। সরকারকে এলডিসি থেকে উত্তরণ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে।” সংলাপে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের এমডি তপন চৌধুরী বলেন, “ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সাধারণ জনগণের টাকা নিয়ে যারা খেলাপি হয়েছেন, তারা দেশে-বিদেশে বহাল তবিয়তে আছেন।”
জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “দেশের বেসরকারি খাত ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। যারা ব্যাংকের ঋণ ফেরত দেয় না, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল ও কর দেয় না, তারাই সম্পদশালী হচ্ছে। রাজনীতিবিদরাই এমন ব্যবস্থা তৈরি করেছেন। ব্যবসায়ীরা পণ্য উৎপাদন ও উদ্ভাবনীর মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করেন। সরকার বেসরকারি খাতের জন্য অনেক কিছু উন্মুক্ত করবে।”
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, “সরকারি অনেক কর্মকর্তা সময়ের মূল্য দেন না। তারা ভাবেন, আগের স্বৈরাচার সরকারের ফাঁসির রায় হয়েছে। এখন সমস্যা নেই। অথচ প্রতি ঘণ্টায় দেশের ঋণের সুদ বাড়ছে ১৪ কোটি টাকা। তাই থেমে থাকার সুযোগ নেই।”
সুদহার নিয়ে উদ্বেগের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “চলতি অর্থবছরের মধ্যেই মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এরপর সুদহার কমানো সম্ভব। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সুদ কমানো মানে অবাস্তব। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃত সুদের হার নেতিবাচক ছিল, যা অর্থনীতিতে বিকৃতি এবং সামষ্টিক চাপ তৈরি করেছে। শিরোনামভিত্তিক মূল্যস্ফীতি এখন ৮ শতাংশের সামান্য ওপরে এবং খাদ্য মূল্যও বেশি। তাই আগামী কয়েক মাস কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা প্রয়োজন।”
চাঁদাবাজি বিষয়ে গভর্নর বলেন, “এক দল চাঁদাবাজি থেকে সরে গেছে, আরেক দল দখল করেছে। সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা দায়ী। যদি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত না বদলায়, অবস্থা পরিবর্তন হবে না। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়েছে। সেগুলো আদালতের বিষয়। ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। কারখানা চালু রেখে আইন প্রয়োগ করা হবে। ব্যক্তিকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
লালদিয়া টার্মিনাল ও পানগাঁও প্রকল্পের চুক্তি নিয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, “চুক্তি দুই সপ্তাহে হয়নি। প্রক্রিয়া ২০২১ সাল থেকে চলমান। বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে বিশ্বমানের বন্দর প্রয়োজন। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অখুশি থাকুক, কাজ চালাতে হবে।”

