দেশে ১২টি নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। মোট ৯১৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসব কেন্দ্র থেকে ২০ বছর মেয়াদে বিদ্যুৎ কেনা হবে। এর মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে বর্তমান সরকার।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দরপত্র ছাড়া বেশ কিছু সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ দর ছিল প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ১৩ টাকার বেশি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেই চুক্তিগুলো বাতিল করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে নতুন প্রকল্প নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন দরপত্রে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় দাম দাঁড়িয়েছে ৯ টাকা ৫৪ পয়সা। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ১২টি কেন্দ্র চালু হলে বছরে প্রায় এক হাজার ১৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনার একটি প্রস্তাব আজ মঙ্গলবার সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উঠছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এ বৈঠকে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করবে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবনায় বলা হয়, বিদ্যুৎখাতের সংস্কার, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গত বছরের ২৫ আগস্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুসরণ করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের জন্য কমিটি একটি খসড়া দরপত্র দলিল প্রস্তুত করে।
এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) বেসরকারি খাতে বিল্ড, ওউন অ্যান্ড অপারেট (বিওও) ভিত্তিতে দেশের ১৪টি স্থানে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। প্রকাশিত দরপত্র অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে নির্মিত ১২টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২০ বছর মেয়াদে বিদ্যুৎ কেনা হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় দরপত্র ছাড়া অযাচিত প্রস্তাবে বেশ কিছু সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গত বছরের ৫ আগস্টের সম্মতিপত্রও বাতিল করা হয়। এসব কেন্দ্রের প্রতি কিলোওয়াট–ঘণ্টা বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল ১৩ টাকার কিছু বেশি। এর বিপরীতে বর্তমান উদ্যোগে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা মেনে প্রতিযোগিতামূলক দর আহ্বান করে নতুন ১২টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৯ টাকা ৫৪ পয়সা।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, বর্তমানে সব ধরনের প্রাথমিক জ্বালানি বিবেচনায় দেশে প্রতি কিলোওয়াট–ঘণ্টা বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ১১ টাকা ৭৮ পয়সা। এর মধ্যে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন ব্যয় ২৭ টাকা ৬৭ পয়সা এবং কয়লাচালিত কেন্দ্র থেকে ১৩ টাকা ১৬ পয়সা। প্রস্তাবিত ১২টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ অনুমোদিত হলে দিনের বেলায় উচ্চমূল্যের তেল বা কয়লাচালিত কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা বা কম চালানো যাবে। এতে সরকারের বড় অঙ্কের ব্যয় সাশ্রয় হবে। বাবিউবোর হিসাব বলছে, নতুন কেন্দ্রগুলো জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে বছরে এক হাজার ১৬৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা সাশ্রয় সম্ভব।
নতুন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে তিনটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে—ফটিকছড়িতে ২০০ ও ৪৫ মেগাওয়াটের দুটি এবং হাটহাজারীতে ১৮ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কক্সবাজারের চকরিয়ার খুটাখালী ও রামুর জোয়ারিয়া নালায় ১০০ মেগাওয়াট করে দুটি কেন্দ্রের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া পাবনা সদরে ১০০ মেগাওয়াট এবং একই জেলার হেমায়েতপুরে ৭০ মেগাওয়াটের দুটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নোয়াখালীর সুধারামে ১০ মেগাওয়াট, মৌলভীবাজারে ২৫ মেগাওয়াট, নীলফামারীর জলঢাকায় ৫০ মেগাওয়াট, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের বিবিয়ানায় ৫০ মেগাওয়াট এবং বাগেরহাটের মোংলার বুড়িরডাঙ্গায় ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব আজ সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উঠবে।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগের সরকারের সময়ে বিশেষ বিধান আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়া অনুমোদিত বেশির ভাগ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। রাজনৈতিক বিবেচনায় অযৌক্তিকভাবে উচ্চমূল্যে এসব অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে অন্তর্বর্তী সরকারের সঠিক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন কেন্দ্র অনুমোদনের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে পুরোনো একটি ব্যবস্থা থেকে নতুন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সময় কিছু ভালো উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এজন্য মধ্যবর্তী একটি ব্যবস্থা থাকা জরুরি, যাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত না হন।
তিনি বলেন, যৌক্তিক প্রকল্পগুলো মধ্যমেয়াদে পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকা উচিত। সরকারের দেওয়া সম্মতিপত্রের ভিত্তিতে বিনিয়োগ হয়েছে। পুনর্বিবেচনার মানে আগের উচ্চমূল্যের চুক্তি নয়। বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। জানা গেছে, আগের সরকারের সময়ে দরপত্র ছাড়া অনুমোদিত ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্মতিপত্র গত বছর বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে ৩১টি প্রকল্প ছিল বেসরকারি খাতে।

