অন্তর্বর্তী সরকার ঋণখেলাপিতে জর্জরিত বেক্সিমকো গ্রুপের কারখানাগুলো উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে টেক্সটাইল ইউনিট পুনরায় চালুর লক্ষ্যে জাপানের রিভাইভাল কোম্পানির সঙ্গে প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি আসে যখন ঋণদাতা ব্যাংকগুলো ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ আদায়ে তৎপর হয়ে উঠেছে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইজারা প্রক্রিয়া পরিচালনা ও তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-কে। গত ৮ ডিসেম্বর বেক্সিমকো ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পার্কের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম ও ব্যবসা পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
যদিও রিভাইভালের সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছিল, কর্মকর্তারা মনে করেন, একক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আসা ইজারা প্রস্তাব সরকারি ক্রয় নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই সরকার চুক্তিতে এগোতে চায়নি। বরং লিজ দেওয়ার পরিবর্তে জনতা ব্যাংক ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে বেক্সিমকো ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পার্কের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিলামে তোলার উদ্যোগ নেয়। তবে বেক্সিমকো গ্রুপের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত নিলামের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে। ফলে নিলাম আর হচ্ছে না।
কার্যবিবরণীর সভায় জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবুর রহমান বলেন, বেক্সিমকো, রিভাইভাল ও জনতা ব্যাংকের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির খসড়া প্রস্তুত ছিল। তবে সরকারি স্বার্থে চুক্তি সম্পাদন সম্ভব হয়নি। ঋণ আদায়ে ব্যাংকের কাছে বেক্সিমকো গ্রুপের জামানত রাখা সম্পত্তি বিক্রির জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, চুক্তি বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বেক্সিমকো গ্রুপ ও রিভাইভাল নিয়ে সভা হয়েছিল। সেই সভায় চুক্তিতে ঐক্যমত হয়নি।
সভায় সভাপতিত্ব করা শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বেক্সিমকো ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পার্কের শিল্প কারখানাগুলোর ইজারা প্রদানের দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টা বিডাকে দিয়েছেন। ফলে উপদেষ্টা পরিষদের আর কোনো করণীয় নেই। তবে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, কারখানার শ্রমিকদের পাওনা মজুরি পরিশোধে সরকার যে ৬০০ কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ দিয়েছে—সেটি আদায়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বেক্সিমকোর সংকট:
বেক্সিমকো টেক্সটাইলস লিমিটেডের আওতায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৫টি কারখানা রয়েছে। মালিক সালমান এফ রহমান, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প উপদেষ্টা ছিলেন। বর্তমানে তিনি একাধিক ফৌজদারি ও দুর্নীতি মামলায় কারাগারে রয়েছেন।
মাসের পর মাস বেতন না দেওয়ায় এবং ঋণখেলাপি বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কারখানাগুলো বন্ধ হয়। শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধে অর্থ মন্ত্রণালয় ৬০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণ দেয়। কারখানা বন্ধ হওয়ার আগে বেক্সিমকো টেক্সটাইলসের ঋণ ছিল প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৩ হাজার কোটি টাকা শুধু জনতা ব্যাংকের কাছে। বর্তমানে সব ঋণই খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকার আগে থেকেই বেক্সিমকোর টেক্সটাইল ইউনিট পুনরায় চালু করার কথা ভাবছে। কারখানাগুলোতে উন্নতমানের মেশিন ও বৈশ্বিক ক্রেতা রয়েছে। কর্মসংস্থান রক্ষার জন্য সরকার তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি চালু করার উদ্যোগ নেয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রিভাইভালের সঙ্গে আলোচনা হয়।
রিভাইভালের খসড়া চুক্তি:
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, রিভাইভাল ২ কোটি ডলার কার্যকরী মূলধন বিনিয়োগ করত। বেক্সিমকোর কোনো ঋণ তার দায়িত্বে থাকত না। যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো ও ব্র্যান্ড ব্যবহার করে কারখানা পরিচালনা করত জাপানি প্রতিষ্ঠানটি। নিট মুনাফার অর্ধেক কমিশন হিসেবে নিত। বাকি মুনাফা দিয়ে জনতা ব্যাংকের ঋণ এবং সরকারের সুদমুক্ত ঋণ পরিশোধের কথা ছিল। বেক্সিমকো সরাসরি কোনো অর্থ পেত না। শেষ পর্যন্ত সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে চুক্তি বাতিল করা হয়।
রিভাইভালের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার বেক্সিমকোর কারখানাগুলো উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রদানের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। রিভাইভাল এখনো সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে।
উন্মুক্ত দরপত্রের যুক্তি:
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদুল হাসান খান বাবু বলেন, সরকারি সম্পৃক্ততা থাকায় উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান যৌক্তিক। তবে কারখানাগুলো এমন অপারেটরের হাতে দেওয়া উচিত, যাদের আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে।
তিনি বলেন, “কারখানা চালালেই প্রফিট হবে—এমন নয়। অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে ঋণ আদায় ও কর্মসংস্থান সুরক্ষা সম্ভব হবে না।”

