ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড আকাশপথে আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার দুর্বল দিক নতুন করে সামনে এনেছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণে কয়েকদিনের জন্য কার্গো কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এতে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।
এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা বিমানবন্দরের বাইরে অফডকভিত্তিক এয়ার কার্গো ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, এটি আকাশপথে পণ্য পরিবহনকে দ্রুত, নিরবচ্ছিন্ন ও সংকটসহনীয় করবে। একই সঙ্গে তারা এয়ার কার্গো অপারেটরস স্টেশন (এসিওএস) নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অফডক ব্যবস্থা না থাকলে যেকোনো সংকটে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
অফডক কী?
অফডক হলো বন্দরের বা বিমানবন্দরের মূল এলাকা ছাড়া একটি নির্ধারিত স্থাপনা, যেখানে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের খালাস, সংরক্ষণ, পরীক্ষা ও হ্যান্ডলিং করা হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, বন্দরের ভেতরের কাজগুলো ছাড়া আলাদা জায়গায় কার্গোর কাজ করা।
নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের মতো আকাশপথেও অফডক ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। তিনি বলেন, বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং সেবা মূলত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস দিয়ে থাকে। তাদের সক্ষমতা সীমিত। অনেক সময় পণ্য খালাসে দুই-তিন দিন বেশি সময় লাগে। এতে রপ্তানি ও আমদানি উভয় ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েন। মোহাম্মদ হাতেম আরও জানান, অফডক চালু হলে পণ্য দ্রুত খালাস হবে। এতে আকাশপথে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরও সহজ ও গতিশীল হবে।
অফডকের প্রয়োজনীয়তা:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অফডক ব্যবস্থা চালু হলে বেসরকারি উদ্যোগে একাধিক অপারেটর থাকবে। ফলে কার্গো আমদানি-রপ্তানিতে টার্মিনাল হ্যান্ডলিং, কার্গো হ্যান্ডলিং, স্ক্যানিং চার্জসহ অন্যান্য ফিতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হবে। একই সঙ্গে সেবার মানও বৃদ্ধি পাবে।
তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আকাশপথে প্রতি কেজি রপ্তানিতে বিমান বাংলাদেশ ও সিভিল এভিয়েশন প্রায় ২৬ টাকা সার্ভিস চার্জ নেয়। একই সেবা ব্যাংকে ৬.৪২ টাকা, কলকাতায় ৪.৮৮ টাকা, দিল্লিতে ৬.১০ টাকা। এতে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, দেশে এয়ার কার্গো অপারেশনে অফডক চালু হলে কার্গো নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। ইলেকট্রনিক কার্গো ট্র্যাকিং সিস্টেম (ইসিটিএস) চালু হবে। ফলে কার্গোর অবস্থান সহজে জানা যাবে, দ্রুত পণ্য খালাসে সুবিধা মিলবে এবং জট কমবে। ওষুধের কাঁচামাল, জরুরি গার্মেন্টস পণ্যের নমুনাসহ আনুষঙ্গিক পণ্যও সহজে পরিবহন করা যাবে।
এছাড়া, ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা এর সুফল ভোগ করতে পারবে। বিশ্বের অনেক দেশে যেমন সিঙ্গাপুর, দুবাই, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, জাপান, ভারত, হংকং, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অফডক ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। সেখানে কার্গো পরিবহনে সময়ের সাশ্রয় এবং পণ্য খালাসে জটিলতা নেই। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে দীর্ঘদিন ধরে অফডক কার্যক্রম সফলভাবে চালু আছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ঢাকা বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় একই ব্যবস্থা চালু হলে আকাশপথে পণ্য পরিবহন আরও সহজ হবে।
নীতিমালা ও বাস্তবায়ন:
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ২৩ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে। তারা উল্লেখ করেছে, ঢাকা বিমানবন্দর ও আশপাশে অফডক সুবিধা চালু হলে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং রপ্তানির গতি বাড়বে। তবে লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কম খরচে ভালো সেবা নিশ্চিত করার স্পষ্ট শর্ত থাকা জরুরি।
বিজিএমইএ জানিয়েছে, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। তাই অফডক ব্যবস্থায় বিমানের সঙ্গে সমন্বয় ও চুক্তি বিষয়টি নীতিমালায় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, অফডক চালু হলে ডিএইচএল বা ফেডেক্সের মতো কুরিয়ার কোম্পানি বন্ড লাইসেন্স নিয়ে এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করার পর সরাসরি ডেলিভারি করতে পারবে। তখন আর বিমানের ওপর নির্ভর করতে হবে না। ফলে সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হবে।
১০ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে ‘এয়ার এক্সপ্রেস সার্ভিস ডেলিভারি’ বিষয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—বিডা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনসহ আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো উপস্থিত ছিলেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) ইতোমধ্যে ‘এয়ার কার্গো অপারেটরস স্টেশন (এসিওএস) স্থাপন, ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, তদারকি ও কাস্টমস নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২৫’ খসড়া প্রণয়ন করেছে।
আইআরডি সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, “অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে যত দ্রুত সম্ভব নীতিমালা চূড়ান্ত করে তা বাস্তবায়ন করতে চাই।”

