২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) শুরু হয় সীমিত বরাদ্দের মধ্য দিয়ে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এই মাসে মাত্র ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দেয়।
প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে সারা বছরে একনেক ১৩টি সভা করে। এ সভাগুলিতে মোট ১ লাখ ৪৬ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ডিসেম্বরে রেকর্ড ৪০টি প্রকল্পের জন্য ৬২ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি সারা বছরের অনুমোদনের ৪৩ শতাংশ এবং বিদায়ী বছরের সবচেয়ে বড় খরচের রেকর্ড।
অর্থনৈতিক চাপের কারণে সরকার বড় কোনো প্রকল্প অনুমোদন দেয়নি। সহজ শর্তে বিদেশি ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বেশি ফি ও পরামর্শকের বোঝা থাকায় তা হয়নি। তবে কয়েক মাস পর কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। সমালোচনা সত্ত্বেও চতুর্থবার সংশোধনের পর অসংখ্য প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় বছরে উন্নয়নখাতে গতি নেই। এডিপি বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে খরচ হয়েছে ৯ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা, মার্চে ৭ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। এইভাবে ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ধীরে ধীরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। নভেম্বরে খরচ মাত্র ৮ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা।
বৃহৎ প্রকল্পের অনুমোদন দিতে সতর্কতা অবলম্বন করেছে সরকার। এমনকি পূর্বে উপস্থাপিত বড় প্রকল্পও একনেক সভায় ফেরত গেছে। উদাহরণ হিসেবে ফরিদপুর থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত চার লেন মহাসড়কের উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ সংশোধন করে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
এছাড়া, জুলাইযোদ্ধা পরিবারের আবাসন প্রকল্পও প্রথমে বাতিল করা হয়। শহিদ পরিবারের স্থায়ী বাসস্থান প্রদানের জন্য ৩৬টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প প্রথমে অনুমোদন পাননি। পরে ১ ডিসেম্বর সরকার পুনরায় অনুমোদন দেয়।
বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন জেলায় ১৩টি নতুন বাফার গোডাউন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ ও পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণও ২৩ ডিসেম্বর পঞ্চমবার সংশোধনের পর অনুমোদিত হয়। বিদায়ী বছরে বহু প্রকল্প চতুর্থবার সংশোধন পায়।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প আসে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা অনুমোদন দেন, তারপর একনেক চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। তবু শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু প্রকল্প প্রথমে অনুমোদন পায়নি। আগস্টে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তে অনুমোদিত হয়।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রকল্পে স্থানীয় সরকারের উদ্যোগও আছে। ইটনা, মিঠামাইন ও অষ্টগ্রাম সংযুক্তকরণ সড়ক নির্মাণ ও জলবায়ু সহনশীল জীবনমান উন্নয়নের জন্য নতুন প্রকল্প উপস্থাপন করা হলেও, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান হাওর অঞ্চলের প্রকল্পের কাঠামো নিয়ে আপত্তি জানান। পরে প্রকল্প পুনর্গঠন করতে বলা হয়।
আইনের মারপ্যাঁচে বড় ঠিকাদাররা আগে প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করতেন। একাধিক প্রকল্প ভাগ করার ঘটনায় জি কে শামিম নামে ঠিকাদার আলোচনায় আসেন। ২০২৫ সালে পিপিআর ২০০৬ সংশোধনের পর ছোট ছোট ঠিকাদার কাজ পাচ্ছেন। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “আগে প্রকল্পগুলো একটি মাফিয়া চক্রের হাতে ছিল। এখন সবাই অংশ নিতে পারবেন। এটি একধরনের সংস্কার।”
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ডিসেম্বরে দুটি একনেক সভায় ৪০টি প্রকল্পের জন্য ৬২ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। সারা বছরে ১৬৫টি প্রকল্পের জন্য ১ লাখ ৪৬ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দেয় সরকার। ১১ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ২৩ ডিসেম্বর ২২টি প্রকল্পের জন্য ৪৬ হাজার ৪২০ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। ১ ডিসেম্বর ১৮টি প্রকল্পের জন্য ১৬ হাজার ৩৩ কোটি টাকা, নভেম্বরে ১২টি প্রকল্পের জন্য ৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকা খরচ অনুমোদন পায়। এছাড়া অক্টোবর ১৩টি প্রকল্পের জন্য ২ হাজার কোটি, সেপ্টেম্বর ১৩টি প্রকল্পের জন্য ৮ হাজার ৩৩৩ কোটি, আগস্টে ১১টি প্রকল্পের জন্য ৭ হাজার ৭১২ কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বাকি মাসেও প্রকল্প অনুমোদন থাকে জুলাইয়ে ১২টির জন্য ৮ হাজার ১৪৯ কোটি, জুনে ১৭টির জন্য ৮ হাজার ৯৭৪ কোটি, মে মাসে ৯টি প্রকল্পের জন্য ৩ হাজার ৭৫৬ কোটি, এপ্রিলে ১৬টি প্রকল্পের জন্য ২৪ হাজার ২৪৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা, মার্চে ১৫টি প্রকল্পের জন্য ২১ হাজার ২৯১ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ১৩টি প্রকল্পের জন্য ১২ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়।

