চারদিকে শীতের প্রকোপ বাড়লেও নগরজীবনে তা তুলনামূলক কম। তবে এক মাস ধরে প্রত্যন্ত গ্রাম ও মফস্বলে হাড়কাঁপানো শীত চলছে। এই সময়ে স্বাবলম্বী ও উচ্চবিত্তরা শপিংমল ও বিপণিবিতানে ভিড় করলেও দেশের বড় অংশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের ভরসা ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ দোকান ও ‘গাঁইট’ বাজার।
দেশজুড়ে পুরোনো শীতের কাপড়ের এই বিশাল চাহিদা মূলত মেটানো হয় চট্টগ্রাম থেকে। জাপান, কোরিয়া, চীন ও তাইওয়ান থেকে এসব কাপড় আমদানি হয়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাসের পর কাপড় আসে খাতুনগঞ্জে। সেখান থেকেই তা ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পুরোনো কাপড়ের বাজারের আকার ছিল প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু নানা সংকটে এবার বিনিয়োগ নেমে এসেছে সর্বোচ্চ শত কোটি টাকায়। শীত মৌসুম শুরু হলেও বিক্রি আশানুরূপ নয়। পাইকারির পাশাপাশি নগরের ফুটপাতের দোকানেও ক্রেতা কম। সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের পাশে চৌকিতে সাজানো শীতের কাপড়। রংচটা পুরোনোর ভেতর থেকেই তুলনামূলক ভালো কাপড় বেছে নিচ্ছেন ক্রেতারা। ১৫০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যেই মিলছে সোয়েটার, কোট ও গেঞ্জি। নগরীর জলসা মার্কেট ও হকার্স মার্কেট স্থানীয়দের কাছে খুচরা ‘গাঁইট মার্কেট’ হিসেবেই পরিচিত। এসব কাপড় মূলত আসে খাতুনগঞ্জ থেকে। সেখানে শতাধিক পুরোনো কাপড়ের পাইকারি দোকান রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নিলামে কেনা পুরোনো কাপড় বন্দর হয়ে খাতুনগঞ্জের কয়েকটি মার্কেটে আসে। এ খাতে আমদানিকারক রয়েছেন প্রায় ৫০ জন। সারাদেশে প্রায় ১০ লাখ পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। খাতুনগঞ্জে শতাধিক পাইকারি দোকানের পাশাপাশি মাঝিরঘাট ও আশপাশে রয়েছে বড় গুদাম। চাহিদা কমলে সেখানে ‘গাঁইট’ সংরক্ষণ করা হয়। এসব কাপড় আনা-নেওয়ায় শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বাবদ বেলপ্রতি গড়ে ১২০ থেকে ১৬০ টাকা ব্যয় হয়।
খুচরা ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত অনেকেই পুরোনো কাপড়ের ওপর নির্ভরশীল। খাতুনগঞ্জের আমির মার্কেটে প্রতি বেল সোয়েটার বিক্রি হচ্ছে আট থেকে ১১ হাজার টাকায়। জ্যাকেটের বেল ১২ থেকে ১৬ হাজার টাকা। গেঞ্জির বেল সাত থেকে আট হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উন্নত দেশে ধোয়ার খরচ বেশি হওয়ায় অনেক সময় কাপড় দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা হয় না। সেসব ব্যবহৃত কাপড় সংগ্রহ করে অনুন্নত দেশগুলোতে বেল আকারে বিক্রি করা হয়। পাইকারিতে এসব কাপড় কেজি দরে বিক্রি হয়। দেখতে ফ্রেশ ও মান ভালো হওয়ায় তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। বাক্সজাত এই প্যাককেই বলা হয় ‘বেল’, যা স্থানীয়ভাবে ‘গাঁইট’ নামে পরিচিত।
বাংলাদেশ পুরোনো কাপড় আমদানিকারক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম জানান, আগে পাঁচ হাজার আমদানিকারককে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এখন তা কমে তিন হাজারে নেমেছে। শর্ত অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৪ টন ও ৫০ হাজার টাকার বেশি কাপড় আমদানি করা যায় না। এরপরও এ বছর গত বছরের তুলনায় অর্ধকোটি টাকার বেশি পুরোনো কাপড় আমদানি হয়েছে। তবে আমদানির তুলনায় বিক্রি নেই।
সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনজুর আলম বলেন, কয়েকদিন তীব্র শীতে চাহিদা বেড়েছিল। এখন শীত কমে যাওয়ায় বিক্রি থেমে গেছে। এ বছর এলসি জটিলতা ও ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে প্রত্যাশামতো আমদানি করা যায়নি।
খাতুনগঞ্জের আড়তদার মেসার্স হাসেম অ্যান্ড ব্রাদার্সের নূর উদ্দিন জানান, কুরিয়ারের মাধ্যমে সারা দেশে কাপড় পাঠানো হয়। বেলপ্রতি পাঁচ থেকে ১২ হাজার টাকায় গাঁইট বিক্রি হয়। জ্যাকেট, সোয়েটার, গেঞ্জি, টি-শার্ট ও জিন্সসহ সব ধরনের শীতের পোশাক রয়েছে। প্রথম পার্টি থেকে কিনে প্রতি বেলে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লাভে বিক্রি করা হয়। তবে গত বছরের মতো এবারও ব্যবসায় ধস নেমেছে।
আমির মার্কেটের মদিনা ট্রেডার্সের মালিক মোহাম্মদ আলী বলেন, এ বছর আমদানি কম করা হয়েছে। তবু বিক্রি তেমন নেই। শীত বাড়লে সামনে পরিস্থিতি ভালো হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সোহেল এমি জানান, সাধারণত নভেম্বর থেকেই বেল বিক্রি জমে ওঠে। অথচ ডিসেম্বর শেষ হয়ে জানুয়ারি এলেও ক্রেতা কম। গত বছর প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫টি বেল বিক্রি হলেও এবার তা নেমে এসেছে ১৫ থেকে ২০টিতে।
মেসার্স ফারুক অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক কাজী জাকির হোসেন আনিছ জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে কাপড় নিতে আসেন। কেউ না এলে মোবাইলে অর্ডার দেন। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় পণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে।
চট্টগ্রামের জহুর হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন বলেন, নগরে শীত কম হলেও নভেম্বর থেকেই ভালো মানের কাপড় দোকানে তোলা হয়েছে। অল্প বিক্রি হলেও গত বছরের তুলনায় কম।
নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার ভাসমান হকার ফোরকান হোসেন জানান, কয়েকজন মিলে খাতুনগঞ্জ থেকে বেল কিনে সাইজ ও মান অনুযায়ী বাছাই করে ভ্যানে বিক্রি করেন। তবে এবার বিক্রি কম। শীত বাড়লে বিক্রি বাড়ে। কারণ বেশিরভাগ ক্রেতাই নিম্ন আয়ের মানুষ।

