কয়েক বছর ধরেই বাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ যেন এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে পরিণত হয়েছিল। রড, সিমেন্ট, ইট—সব কিছুর দামই একসময় এমন উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে অনেকেই নির্মাণের পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হন। তবে গত এক বছরে সেই চিত্র কিছুটা বদলেছে। অধিকাংশ নির্মাণসামগ্রীর দাম কমেছে। তবু আশ্চর্যের বিষয় হলো—নির্মাণকাজে তেমন গতি ফেরেনি। উল্টো কাজের পরিমাণ আগের তুলনায় কমেছে, বিক্রিও কমেছে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে। অথচ ফ্ল্যাটের দাম এখনো নড়াচড়া করছে না।
রাজধানীর বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ রডের দাম বর্তমানে তুলনামূলকভাবে নিচে। এখন প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে ৭৫ হাজার থেকে ৮৪ হাজার টাকার মধ্যে, যেখানে গত বছর এই দাম ছিল ৮০ থেকে ৮৬ হাজার টাকা। এরও আগে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে রডের দাম এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ব্যবসায়ীদের মতে, গত বছরের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন প্রকল্প শুরু হওয়ার হার কমে গেছে। ফলে রডের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। শুধু বড় প্রকল্প নয়, ব্যক্তিপর্যায়ের বাড়ি নির্মাণেও অনীহা দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে।
রডের পাশাপাশি অন্যান্য স্টিলজাত পণ্যের দামেও কমতির ছাপ স্পষ্ট। বর্তমানে অ্যাঙ্গেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি টন ৮৫ থেকে ৮৭ হাজার টাকায়, যা আগে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেশি ছিল। মোটা প্লেটের দাম কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা, আর পাতলা প্লেট বিক্রি হচ্ছে প্রতি টন প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। এলাকা ভেদে দামে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজারে দাম নিম্নমুখী।
ইট ও সিমেন্টের বাজারেও এসেছে স্বস্তি। একসময় যেখানে ইটের দাম ছিল ১৩ থেকে ১৪ টাকা পর্যন্ত, এখন মানভেদে তা নেমে এসেছে ৮ থেকে ১২ টাকায়। ট্রাকভাড়া-সহ তিন হাজার ইট কিনতে বর্তমানে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩১ থেকে ৩২ হাজার টাকা, যা গত বছর ছিল ৪২ থেকে ৪৩ হাজার টাকা। সিমেন্টের দামও কমেছে। প্রতি বস্তায় ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে এখন সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪৯৫ থেকে ৫২০ টাকার মধ্যে, যেখানে এক বছর আগে তা ৫৫০ টাকার ওপরে ছিল।
তবে সব উপকরণে দাম কমেনি। বালুর বাজারে ঠিক উল্টো চিত্র। গত ছয় মাসে বালুর দাম বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। বর্তমানে সাদা বালু বিক্রি হচ্ছে প্রতি ঘনফুট ৩০ থেকে ৩২ টাকায়, যা কয়েক মাস আগেও ছিল ১৮ থেকে ২০ টাকা। লাল বালুর দাম আরও চড়া—এখন প্রতি ঘনফুট ৫২ থেকে ৬২ টাকা, যেখানে আগে ছিল ৪০ থেকে ৪২ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। এতে সরবরাহ কমে গেছে, আর সেই সুযোগে বালুর দাম বেড়েছে। ঢাকার একজন বালু ব্যবসায়ীর ভাষায়, সরবরাহ কম থাকায় বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না।
নির্মাণসামগ্রীর বিক্রেতারাও কাজের অভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, দাম কমলেও ক্রেতা নেই। আগে যেখানে প্রতিদিন যে পরিমাণ মাল বিক্রি হতো, এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। যদিও শীত মৌসুম শুরু হওয়ায় সামনে নির্মাণকাজ কিছুটা বাড়তে পারে—এমন আশা এখনো করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটা শুধু দামের নয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং আবাসন খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে মানুষ নতুন করে নির্মাণে যেতে সাহস পাচ্ছে না। ফলে নির্মাণসামগ্রীর দামে কিছুটা স্বস্তি এলেও পুরো খাত এখনো চাঙা হয়ে ওঠেনি।

