মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সরকারি ব্যাংকঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৫৪২ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যয় ও পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের জন্য সরকারের দেওয়া মূলধন সহায়তার কারণে ঋণ বেড়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজেটে নির্ধারিত ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ঋণ বাড়ার ফলে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। এতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জাতীয় প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণে সরকার যে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে, সেটিই ব্যাংক ঋণের বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। নির্বাচনি ব্যয় বাড়লে ঋণও বাড়বে। ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়ায় ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাধা তৈরি হবে। তিনি সুদের কম বিদেশি অর্থায়নের দিকে নজর দেওয়ার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারের ব্যাংকঋণ ছিল খুবই সীমিত। এর প্রধান কারণ ছিল উন্নয়ন ব্যয়ের স্থবিরতা। তবে পরবর্তী দুই সপ্তাহে ঋণ দ্রুত বেড়ে মোট ৪৫ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা হয়েছে। একই সময়ে ১ জুলাই থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নিট ব্যাংকঋণ ছিল মাত্র ১১ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত ৪৩ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়েছে। এদিকে প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার মাত্র ১১.৭৫ শতাংশ, যা শেষ ছয় বছরে সর্বনিম্ন। রাজস্ব আদায় প্রথম চার মাসে ১৫.৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই প্রবৃদ্ধি স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের নিট ঋণের মধ্যে তফসিলি ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২২ হাজার ১১ কোটি টাকা। এক মাস আগেও তফসিলি ব্যাংকের ঋণ ছিল ৯ হাজার ৭০৪ কোটি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ডিসেম্বর মাসে পরিকল্পিত ঋণ গ্রহণের বাইরে দুটি অতিরিক্ত নিলামের মাধ্যমে সরকার ১০ হাজার কোটি টাকা তোলেছে। ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ও পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে সুদহার ছিল ১০.৫৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের কারণে ঋণ বেড়েছে, তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এখনো কম। ব্যাংকগুলোতে কোনো সংকট হবে না।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, উন্নয়ন ব্যয় কম থাকায় ঋণের প্রয়োজন কম। তবে পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায় ঋণ কিছুটা বেড়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা না থাকায় ব্যাংক ঋণ দেওয়ায় কোনো সমস্যা নেই।
এদিকে ব্যাংক ঋণ বেড়ে গেলেও সঞ্চয়পত্রে সরকার ঋণ নিচ্ছে না। সুদহার কমানো হয়েছে এবং বিক্রিতে কড়াকড়ি রয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ২ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ৫ হাজার ১০৭ কোটি টাকার তুলনায় ৫৩ শতাংশ কম। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে সুদহার আরও কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

