বাংলাদেশে নগদ টাকার প্রাধান্য ধীরে ধীরে কমছে। দৈনন্দিন কেনাকাটা হোক বা বড় অঙ্কের লেনদেন—সবক্ষেত্রে ক্রমেই জায়গা করে নিচ্ছে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রি-পেইড কার্ডের মতো ‘প্লাস্টিক মানি’। কার্ড ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ক্যাশলেস হওয়ার দিকে এগোচ্ছে, যা এখন আর কল্পনা নয়, বরং বাস্তবতা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে কার্ড ইস্যু এবং লেনদেন—উভয় ক্ষেত্রেই চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি হয়েছে। ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি ৯ লাখ, ক্রেডিট কার্ড ১৬ লাখ, আর প্রি-পেইড কার্ড ছয় লাখের বেশি। কিন্তু ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে চার কোটি ৬ লাখ, ২৮ লাখ এবং ৯৩ লাখ। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে তিন ধরনের কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে ১২৭ শতাংশ।
কার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ২০২০ সালে নভেম্বর মাসে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন ছিল প্রায় ১৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তা দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকায়, যা ১৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের কার্ড লেনদেনও দেশীয় বিদেশি নাগরিকদের তুলনায় বেশি। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশিরা বিদেশে যে পরিমাণ খরচ করেছেন, তা দেশেই অবস্থানরত বিদেশিদের খরচের প্রায় ৪.৭৮ গুণ।
দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে ভিসা ক্রেডিট কার্ড। দেশীয় নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে, আর বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন মার্কিন নাগরিক হিসেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার জন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই ফল দেখাচ্ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তারা ক্রমেই ডিজিটাল আর্থিক সেবার দিকে ঝুঁকছেন, ফলে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের প্রবৃদ্ধি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
মাসভিত্তিক বিশ্লেষণও দেখাচ্ছে, সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবর মাসে দেশ-বিদেশ উভয় ক্ষেত্রেই কার্ড ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যয় সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৪৯৪ কোটি টাকা, যা অক্টোবরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩৪ কোটি টাকা। এই খাতে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে, এরপর থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারত। একই সময়ে বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ১৭৫ কোটি টাকা খরচ করেছিল, অক্টোবরে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি।
দেশের অভ্যন্তরেও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের ৩ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা লেনদেন অক্টোবরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৭১ কোটি টাকায়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক লেনদেনের সম্প্রসারণ এবং ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কার্ড ব্যবহার আরও টেকসই ও শক্তিশালী হবে। ফলে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা ক্রমেই আরও ডিজিটাল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আধুনিক ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে ধাবিত হবে।

