সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবীদের মধ্যে রিমোট ওয়ার্কের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোম্পানি এখন বাংলাদেশের কর্মীদের বিপিও, ফ্রিল্যান্সিং ও চুক্তিভিত্তিক সেবার মাধ্যমে দূর থেকে কাজের সুযোগ দিচ্ছে।
এই কাজে যুক্ত অনেকেই বিদেশি মুদ্রায় আয় করছেন। সেই অর্থ তারা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠাচ্ছেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে রিমোট কর্মীদের অবদানও বাড়ছে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি সাধারণ ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বিদেশ থেকে টাকা এলেই তা রেমিট্যান্স এবং তাই করমুক্ত। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, রিমোট কাজ বা বিপিও সেবা থেকে প্রাপ্ত আয়ের করযোগ্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আইন বলছে, এই আয় করমুক্ত হবে কি না, তা মূলত নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর-নিবাসী অবস্থান এবং আয়ের উৎস কোথায় সৃষ্টি হচ্ছে, তার ওপর।
অর্থাৎ কেউ বাংলাদেশে কর-নিবাসী হলে এবং তার আয়ের উৎস নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না করলে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া আয়ও করযোগ্য হতে পারে। শুধু বিদেশ থেকে অর্থ দেশে আসছে বলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত রেমিট্যান্স হিসেবে ধরা যাবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিমোট ওয়ার্কে যুক্ত পেশাজীবীদের আয়কর আইন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে করসংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।
মূল প্রশ্নটি আসলে অন্য জায়গায়। তা হলো, কারা রেসিডেন্ট বা নিবাসী করদাতা হিসেবে বিবেচিত হবেন। আয়কর আইন ২০২৩–এর ধারা ২৬–এ এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, যিনি রেসিডেন্ট করদাতা, তিনি দেশে বা বিদেশে যেখানেই আয় করুন না কেন, তার সব আয়ই করের আওতাভুক্ত হবে।
ধারা ২(৪৫) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি সংশ্লিষ্ট করবর্ষে অন্তত ১৮৩ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করেন, অথবা ওই বছরে ৯০ দিন এবং তার আগের চার বছরে মোট ৩৬৫ দিন বাংলাদেশে থাকেন, তাহলে তিনি রেসিডেন্ট করদাতা হিসেবে গণ্য হবেন। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, যারা বাংলাদেশে অবস্থান করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য রিমোট কাজ করছেন, তাদের বড় অংশই রেসিডেন্ট করদাতা। ফলে তাদের বৈশ্বিক আয়, অর্থাৎ দেশি ও বিদেশি সব আয়ই করযোগ্য।
এখন আসে আয়ের উৎসের প্রশ্ন। বিদেশ থেকে অর্থ এলে অনেকেই সেটিকে বিদেশি উৎসের আয় বলে মনে করেন। কিন্তু কর নির্ধারণে ‘আয়ের উৎস’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আয়কর আইন ২০২৩–এর ধারা ২৭–এ বলা হয়েছে, যে আয় বাংলাদেশে ‘উপার্জিত, উপচিত বা উদ্ভূত’ বলে গণ্য হবে, সেটি করযোগ্য আয়।
আইন অনুযায়ী, কেউ যদি বাংলাদেশে বসে বিদেশি প্রতিষ্ঠানে সেবা দেন, তাহলে সেই সেবার বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স হিসেবে এলেও তা বাংলাদেশের উৎসে অর্জিত আয় হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে এ ধরনের আয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত নয়।
আইনে আরও উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশে সম্পাদিত চাকরি বা সেবা থেকে প্রাপ্ত আয়, বাংলাদেশে অবস্থিত স্থাপনা বা সম্পত্তি থেকে অর্জিত আয়, সরকার বা কোনো রেসিডেন্ট ব্যক্তির প্রদত্ত ফি, সুদ, রয়্যালটি কিংবা কারিগরি সেবার বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ—সবই বাংলাদেশের উৎসের আয় হিসেবে গণ্য হবে এবং করের আওতায় পড়বে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, রিমোট ওয়ার্ক বা ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত ব্যক্তিদের কর-নিবাসী অবস্থান ও আয়ের উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে করসংক্রান্ত জটিলতা ও ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে।
তবে আইন কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে করমুক্ত সুবিধা প্রদান করে। আয়কর অধ্যাদেশের ষষ্ঠ তফসিলের প্রথম অংশের ধারা ১৭–এ বলা হয়েছে, যে কোনো স্বাভাবিক করদাতা যদি বিদেশে থেকে আয় উপার্জন করেন এবং সেই আয় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠান, তবে সেই আয় মোট আয়ের হিসাব থেকে বাদ যাবে, অর্থাৎ করমুক্ত হবে।
কিন্তু এই সুবিধা কেবল তখনই প্রযোজ্য, যখন করদাতা বিদেশে গিয়ে কাজ করে আয় উপার্জন করছেন। দেশে বসে রিমোট কাজ করে বিদেশি আয় করলে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। কারণ, তারা রেসিডেন্ট করদাতা হিসেবে গণ্য হয়। ফলে যারা দেশে থেকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, তারা এই করমুক্ত সুবিধা পাবেন না।
আবার প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা আয়ের কিছু খাতে বিশেষ করমুক্ত সুবিধা রয়েছে। ষষ্ঠ তফসিলের প্রথম অংশের ধারা ২১–এ বলা হয়েছে, ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত নিম্নলিখিত খাতের ব্যবসা থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত হবে:
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সমাধান উন্নয়ন
- ব্লকচেইন সমাধান উন্নয়ন
- রোবোটিক প্রসেস আউটসোর্সিং
- সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস
- সাইবার সিকিউরিটি সেবা
- ডিজিটাল ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ডেটা সায়েন্স
- মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট
- সফটওয়্যার উন্নয়ন ও কাস্টমাইজেশন
- সফটওয়্যার টেস্ট ল্যাব সেবা
- ওয়েব লিস্টিং ও ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট
- আইটি সাপোর্ট ও সফটওয়্যার মেইনটেন্যান্স
- জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সেবা
- ডিজিটাল অ্যানিমেশন ও গ্রাফিক ডিজাইন
- ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রি ও প্রসেসিং
- ই–লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও ই–পাবলিকেশন
- আইটি ফ্রিল্যান্সিং
- কল সেন্টার সেবা
- ডকুমেন্ট কনভারশন, ইমেজিং ও ডিজিটাল আর্কাইভিং
এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে কেবল তখনই, যখন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই সেবাগুলো ব্যবসা হিসেবে পরিচালনা করবে এবং সব আর্থিক লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন এবং বিআইএন নিতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো উৎসে কর কর্তন। আয়কর আইন ২০২৩–এর ধারা ১২৪ অনুযায়ী, রেসিডেন্ট বা নিবাসী করদাতার বিদেশ থেকে প্রাপ্ত সেবা ফি বা রেভিনিউ শেয়ারিং দেশে এলে এবং তা বাংলাদেশের ভেতর সম্পাদিত সেবার বিনিময়ে অর্জিত হিসেবে গণ্য হলে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা বাধ্যতামূলক। অনেক ব্যাংক রেমিট্যান্সের টাকা ব্যাংক একাউন্টে জমা দেওয়ার সময়ই এই কর কর্তন করে। ধারা ১৫০–এর নির্দেশনা অনুযায়ী, এই উৎসে কর্তিত করকে রিটার্নে মোট করদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। কিন্তু অনেক করদাতা ব্যাংক থেকে কর কর্তনের চালান সংগ্রহ না করার কারণে ইতোমধ্যে দেওয়া করের সুবিধা ভোগ করতে পারেন না।
রিমোট কাজের আয় করযোগ্য হবে কি না, তা নির্ভর করে ব্যক্তি ব্যবসায় নিযুক্ত আছেন নাকি চাকরিজীবী—তার ওপর। আপওয়ার্ক, ফাইভার বা প্রজেক্টভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ সাধারণত ব্যবসায়িক আয় হিসেবে গণ্য হয়। যদি তা আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসার মানদণ্ড পূরণ করে, তবে করমুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন পেলে তা চাকরিজনিত আয় হিসেবে গণ্য হবে এবং বাংলাদেশে কর দিতে হবে।
করমুক্ত রেমিট্যান্স সুবিধা কেবল তাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা শারীরিকভাবে বিদেশে কর্মরত থেকে আয় উপার্জন করেন এবং সেই আয় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠান। রিমোট কর্মীরা বাংলাদেশ থেকেই সেবা প্রদান করেন, তাই তাদের আয় বিদেশে কর্মসংস্থানজনিত করমুক্ত রেমিট্যান্স হিসেবে গণ্য হয় না এবং দেশীয় কর বিধান অনুযায়ী করযোগ্য।
তাই বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে যুক্ত তরুণদের জন্য কর-দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। অনেক রিমোট কর্মী প্রশ্ন করেন, “দেশে বসে অর্জিত আয় যখন ব্যক্তির নিজের প্রচেষ্টায় আসে, কেন তার উপর কর আরোপ?” এর উত্তর স্পষ্ট—রাষ্ট্রের করব্যবস্থা নাগরিকের অবস্থান, কর্মকাণ্ড এবং আয়ের উৎসের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। কর আদায়ের উদ্দেশ্য জনস্বার্থে ব্যয় নিশ্চিত করা।
আজকের ডিজিটাল অর্থনীতিতে রিমোট কাজ একটি বাস্তবতা। এই বাস্তবতা আইনকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তাই প্রয়োজন আইন সম্পর্কে সচেতনতা এবং নিজের কর-নিবাসী অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। “রেমিট্যান্স মানেই করমুক্ত” এই ভুল ধারণা থেকে বের হতে হবে। আইন অনুযায়ী করযোগ্য আয় যথাযথভাবে ঘোষণা ও পরিশোধ করা নাগরিকের দায়িত্ব। রাষ্ট্র রাজস্বে স্বচ্ছতা চায়, ব্যক্তি চায় নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায়। রিমোট কর্মীরা যদি আইন বুঝে এবং সঠিকভাবে কর রিটার্ন দাখিল করেন, তবে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয়ই উপকৃত হবে। ভুল ধারণা নয়, আইনের সঠিক ব্যাখ্যাই হোক আমাদের পথপ্রদর্শক।

