খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংস্কারের শক্ত ভিত্তি রচিত হয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পরপরই শুরু হয় এমন কিছু উদ্যোগ, যা পরবর্তী এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনীতিকে নতুন পথে পরিচালিত করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ১৯৯১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সময়কাল ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের স্বর্ণযুগ। এই সময়ের সংস্কারগুলোর মূল ভিত তৈরি হয় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে। নব্বইয়ের আগে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল অন্তর্মুখী। রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত এই মডেলটি অনেকটাই সোভিয়েত ইউনিয়নধর্মী ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির যোগাযোগ ছিল সীমিত। বিশ্বজুড়ে নব্বইয়ের দশকে বিশ্বায়নের গতি বাড়তে থাকলে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থনীতিকে প্রস্তুত করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
১৯৯১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর খালেদা জিয়া দ্রুত সেই উদ্যোগ নেন। তিনি দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের কেবিনেটের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন। তাঁদের কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। সংস্কার কার্যক্রমে রাজনৈতিক আস্থা ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের সমর্থন নিশ্চিত করা হয়। সংস্কার বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার করা হয়। খালেদা জিয়া নিজেই কেবিনেটকে সক্রিয় রাখেন। এতে সংস্কারমুখী মন্ত্রণালয়গুলো প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পায়। নীতিগত সিদ্ধান্ত কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়।
এই সময় অর্থনীতিকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় দিক থেকে উন্মুক্ত করতে কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা হয়। এতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। তিনি অর্থনীতি উদারীকরণে সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। এসব উদ্যোগে খালেদা জিয়ার পূর্ণ রাজনৈতিক সমর্থন ছিল।
১৯৯১ সালের পর ব্যাপকভাবে বাণিজ্য উদারীকরণ শুরু হয়। কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করা হয়। এর আগে সরকার নির্ধারণ করত কোন পণ্য কত পরিমাণ আমদানি করা যাবে। কাপড়, চিনি, লবণসহ প্রায় সব আমদানিযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রেই এই প্রথা চালু ছিল। খালেদা জিয়ার সরকার এই ব্যবস্থা তুলে দেয়।
একই সঙ্গে ট্যারিফ উদারীকরণ করা হয়। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের শুল্ক কমানোর বদলে সামগ্রিকভাবে আমদানিপণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে বাজার পরিচালিত হওয়া নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো।
১৯৯১ সালে দেশের আর্থিক খাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্পদ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এটি ব্যাংকিং খাতে সরকারি আধিপত্যের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অক্ষুণ্ন রেখেই খালেদা জিয়ার সরকার বেসরকারি ব্যাংকের জন্য খাতটি উন্মুক্ত করে দেয়। এর ফলে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক আধুনিক ব্যাংকিং চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং ব্যবস্থাও ছিল বড় বাধা। এর উৎস ছিল কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাভিত্তিক অর্থনৈতিক ধারণা। খালেদা জিয়ার সরকার এই জটিল লাইসেন্সিং কাঠামো ভেঙে দেয়। এতে ডিরেগুলেশন সংস্কারের পথ উন্মুক্ত হয়। যদিও এরশাদ সরকারের সময় সীমিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো কার্যকর হয়নি।
লোকসান গুনতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে উঠছিল। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রথমবারের মতো এসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়। এর মাধ্যমে জবাবদিহি ও কার্যকারিতা তদারকির ব্যবস্থা চালু হয়।
সরকারি মালিকানা বজায় রেখেই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়। এতে তারা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পায়। বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমে আসে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠান গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়।
সামাজিক খাতেও বড় পরিবর্তন আসে। প্রাথমিক শিক্ষা বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক করা হয়। এটি খালেদা জিয়ার অন্যতম বড় সামাজিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। যে সময় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো দেশে নারী শিক্ষায় বাধা দেওয়া হচ্ছিল, সে সময় বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষায় সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করা হয়। পরে এটি সারাদেশে সম্প্রসারিত হয়। এর ফলে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
নারী শিক্ষার এই অগ্রগতি শিল্পায়নে বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে এর প্রভাব স্পষ্ট। গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে সাধারণত ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি পাস শ্রমিক প্রয়োজন হতো। আগাম শিক্ষা বিনিয়োগ না হলে এই শ্রমশক্তি তৈরি সম্ভব হতো না। খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার–এনজিও সহযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আমলাতন্ত্রকে এনজিওগুলোর সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়।
কৃষি, শিক্ষা ও গ্রামীণ উন্নয়নে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সহায়তা বাড়ে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন এনজিও সক্রিয় থাকলেও সরকার–এনজিও সহযোগিতা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় খালেদা জিয়ার আমলেই। এই সময় সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু না হলেও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা হয়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে দেওয়া হয়। এর আগে এসব দায়িত্ব সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে কর্তৃত্ব বিভাজন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করে খালেদা জিয়ার সরকার। সব মিলিয়ে ১৯৯১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সময়কাল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই।
সূত্র: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

