দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা বাড়ছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনেক শিল্পকারখানার মালিক পলাতক বা কারাগারে থাকায় বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এতে চাকরি হারান অসংখ্য শ্রমিক। প্রত্যাশা অনুযায়ী নতুন বিনিয়োগও আসছে না।
এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ প্রায় ৪০ লাখ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে সহায়ক হচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স।
একসময় ডলারের দাম নিয়মিত বাড়ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে প্রতিদিন ডলার বিক্রি করত। এখন পরিস্থিতি উল্টো। ডলারের দাম বেশি না কমে যায়, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে মোট ৩১৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। গত বছরের জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কেনা শুরু করে।
দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ ছিল ২০২১ সালের আগস্টে। তখন রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৮ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে কমতে কমতে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় রিজার্ভ নেমে আসে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। ওই সময়ে রিজার্ভ থেকে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ডিসেম্বর মাসের প্রথম ২৯ দিনেই রেমিট্যান্স এসেছে ৩০৪ কোটি ডলার। মাস শেষ হওয়ার আগেই রেমিট্যান্স তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এটি গত বছরের পুরো ডিসেম্বর এবং আগের মাসের তুলনায় অনেক বেশি। এর আগে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের মার্চ মাসে। ঈদ ও রোজাকে কেন্দ্র করে তখন ৩৩০ কোটি ডলার পাঠান প্রবাসীরা।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের মাত্র দুদিন বাকি থাকতে দেশে এসেছে মোট তিন হাজার ২৬৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স। আগের বছর একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল দুই হাজার ৬৭৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত এসেছে এক হাজার ৬০৮ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি।
গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসে রেকর্ড ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি ছিল। ওই উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় চলতি বছরেও রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অর্থনীতিকে স্বস্তি দিচ্ছে।
রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী প্রবাহের ফলে গতকাল বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ হয়েছে ২৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। এটি প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০২৩ সালের জুন থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় তা কমে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আগের সরকারের সময়ে সবচেয়ে বড় অস্বস্তি ছিল ডলার বাজার নিয়ে। ডলার সংকট ও দর বৃদ্ধিকে তখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হতো। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তঃব্যাংক ডলারের দর ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। এখন ডলার পেতেও তেমন সমস্যা হচ্ছে না। এর প্রভাবে দীর্ঘদিন দুই অঙ্কে থাকা মূল্যস্ফীতি কমে গত নভেম্বর শেষে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমার পেছনে বড় কারণ ছিল লুটের অর্থনীতি। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। সে সময় দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদহার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিশ্ববাজারে সুদহার দ্রুত বাড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারের নানা ছাড় ও সুযোগকে কেন্দ্র করে সেই সময় বিভিন্ন অজুহাতে দেশ থেকে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচার হয়। এর ফলেই ২০২১ সালের মাঝামাঝিতে ৮৪ টাকার ডলারের দর বেড়ে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় পৌঁছায়।
২০২৩ সালে আইএমএফ থেকে ঋণ নেওয়ার পর সংস্থাটির শর্ত অনুযায়ী ২০২৪ সালে এসে কিছুটা আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা শুরু হয়।

