নতুন আশা নিয়ে দরজায় কড়া নেড়েছে খ্রিষ্টীয় বছর ২০২৬। বিদায় নিয়েছে ২০২৫, যা আমাদের দিয়েছে নানা নতুন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও সংস্কারের কিছু উদ্যোগ আমরা ২০২৫ সালে দেখতে পেয়েছি।
তবে বছরটি কষ্টসাধ্য ও স্মরণীয়ও ছিল। দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। এর কয়েক দিন আগে হারিয়েছি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকেও। তিনি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের সম্মুখভাগের নেতাদের একজন। রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের দেশে ফেরায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে ছিল নানা দাবি-দাওয়া ও আন্দোলন। এনবিআরের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে সংস্থাটি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। আন্দোলনে যুক্ত অনেককেই চাকরি হারাতে হয়েছে বা বদলি করা হয়েছে। রাজনৈতিক চাপের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের দিন-তারিখও ঘোষণা করা হয়। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই আমরা দাঁড়িয়ে আছি ২০২৬ সালের দরজায়, নতুন আশা ও নতুন অঙ্গীকারের সঙ্গে।
পুরোনো বছর সহজ ছিল না। অর্থনীতিতে চাপ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও সুশাসনের ঘাটতি প্রতিদিনের আলোচনার অংশ ছিল। কোথাও উন্নয়ন থেমে গেছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অনিয়মে, আবার কোথাও পরিকল্পনার অভাবে সম্ভাবনা পূর্ণতা পায়নি। তবু বাংলাদেশ থেমে থাকেনি। সংকটের ভেতর দিয়েই আমরা শিখেছি টিকে থাকার কৌশল, নতুন কিছু ভাবার ধারা।
২০২৬ আমাদের সামনে এনে দিয়েছে সুযোগ, ভুল শুধরে নেওয়ার এবং অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলার। নতুন বছরে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা সুশাসন। প্রশাসন ও রাজনীতিতে জবাবদিহিতা বাড়লে, আইনের শাসন শক্ত হলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিলে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যান নয়, মানুষের জীবনে স্পষ্ট রূপ নেবে।
সমৃদ্ধ অর্থনীতি নতুন বছরের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, তরুণদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান, কৃষি ও শিল্পে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার-এসবই হতে পারে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রবাসী আয়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করবে।
নতুন বছরে আমরা চাই মানবিক বাংলাদেশ, যেখানে উন্নয়নের সুফল শহর-গ্রামে সমানভাবে পৌঁছাবে। যেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য হবে অধিকার, দয়া নয়। তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি এবং নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ যদি নীতিনির্ধারণ ও কর্মক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যায়, তবে উন্নয়ন হবে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
২০২৬ হোক আত্মবিশ্বাসের বছর। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার সাহস দেখাতে হবে। পুরোনো বছরের গ্লানি পেছনে ফেলে আমাদের প্রত্যাশা একটাই—একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যারা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও দেশের অর্থনীতি ধরে রাখতে পেরেছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে সে দিক দিয়ে সাধুবাদ জানাতে হবে।
তবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ভালো রাজনীতিবিদদের হাতে থাকাই উত্তম। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা চাই সুষ্ঠু নির্বাচন, পরিচ্ছন্ন রাজনীতি ও কার্যকর নেতৃত্ব। এ মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াক, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ভার কমে আসুক, কর্মক্ষম মানুষের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত হোক এবং মানুষের জীবনে প্রশান্তি ফিরে আসুক।
নতুন বছরে এই প্রত্যাশা নিয়েই সিটিজেনস ভয়েসের পক্ষ থেকে পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, এজেন্ট এবং সমগ্র দেশবাসীকে জানাই শুভেচ্ছা।

