টানা কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাওয়ার পর ২০২৬ সালকে ঘিরে বাংলাদেশে আবারও এক ধরনের সতর্ক আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ চাপের পর অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াক বা না দাঁড়াক, অন্তত স্থিতিশীলতার পথে ফেরার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হচ্ছে।বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক আস্থা ফিরলে তার ইতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তাঁদের মতে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হলে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে, যার প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে। তবে একই সঙ্গে তাঁরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু নির্বাচন হলেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে—এমন সরল সমীকরণ নেই। নতুন সরকারকে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে দৃঢ়তা দেখাতে হবে, নতুবা পুরোনো সংকটগুলো নতুন মোড়কে ফিরে আসতে পারে।
মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ ছায়া, স্বস্তির ইঙ্গিত থাকলেও উদ্বেগ কাটেনি:
২০২৫ সালের বেশির ভাগ সময়জুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত করেছে। চাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি মানুষের প্রকৃত আয়কে ক্ষয় করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে, যা অক্টোবরে ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। ফলে আয় বাড়লেও খরচের চাপে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাস্তবে কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম কমার প্রবণতা এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করায় ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমতে পারে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে নেমে আসা একটি স্বস্তির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, বাজার তদারকি জোরদার না হলে, সরবরাহ ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকলে এবং মুদ্রানীতির কড়াকড়ি শিথিল হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়তে পারে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নির্বাচন, আস্থার পুনর্গঠনের প্রধান শর্ত:
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা হলো ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর। তাঁর মতে, নতুন সরকার এই রাজনৈতিক ম্যান্ডেট কাজে লাগিয়ে ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে অর্থনীতিকে পরিচালিত করতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজও একই ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিরতা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়াবে। এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের আয় ও ভোগক্ষমতা বাড়বে এবং অর্থনীতির গতি ফিরবে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, বাণিজ্য অংশীদার ও উন্নয়ন সহযোগীরাও আরও সক্রিয় হবে।
ব্যাংকিং খাত, বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে পুনর্গঠনের কঠিন লড়াই:
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হিসেবে ব্যাংকিং খাত ২০২৫ সালে চূড়ান্তভাবে আলোচনায় আসে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, অর্থ পাচার ও দুর্বল তদারকির অভিযোগ বহুদিন ধরেই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর লুকানো খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। ফলে খেলাপি ঋণের অঙ্ক দ্রুত বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ সংকেত। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক—একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই একীভূতকরণের মাধ্যমে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। এর পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা। একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। তবে এসব ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশই খেলাপি হওয়ায় আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের সংকট, প্রবৃদ্ধির বড় বাধা:
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ স্থবিরতা এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। এই নিম্নমুখী প্রবণতা নতুন বিনিয়োগের দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে।
নতুন বিনিয়োগ না হলে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যায়, শিল্প সম্প্রসারণ থমকে যায় এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হয় না। ফলে প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ে। এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশের কাছাকাছি আটকে আছে, যা অর্থনীতিকে গতি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
রাজস্ব আদায় ও এনবিআরের আন্দোলন, সংস্কারের পথে বড় ধাক্কা:
২০২৫ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নজিরবিহীন আন্দোলন রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায়। নতুন অর্থবছরের প্রাক্কালে এনবিআর বিলুপ্তির প্রতিবাদে দেড় মাসের আন্দোলনের ফলে আমদানি-রপ্তানি ও রাজস্ব কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। একপর্যায়ে দুই দিন সব ধরনের রাজস্ব আদায় কার্যক্রম বন্ধ থাকে, এমনকি চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
এই আন্দোলনের প্রভাবে রাজস্ব সংগ্রহ কমে যায়, যা সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও চাপে ফেলে। আন্দোলন প্রত্যাহারের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এর অর্থনৈতিক ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি, উন্নয়ন ব্যয়ের দুর্বলতা:
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন ছিল সর্বকালের সর্বনিম্ন, ৬৮ শতাংশেরও কম। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এডিপির আকার কমিয়ে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা করা হলেও বাস্তবায়নের গতি বাড়েনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাস্তবায়নের হার মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
সরকারি ক্রয় আইন ও অনলাইনভিত্তিক প্রক্রিয়া চালু করা হলেও বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত গতি না আসা প্রশাসনিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরে।
রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স, সংকটের মাঝেও স্বস্তির জায়গা:
এই সব সংকটের মাঝেও স্বস্তির খবর এসেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয় থেকে। ২০২৫ সালের আগস্টে যেখানে রিজার্ভ ছিল প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে প্রবাসী আয় এসেছে ১৩ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি।
অর্থ পাচার কমে যাওয়া, বিনিময় হারকে প্রায় বাজারভিত্তিক করা এবং প্রবাসী কর্মসংস্থান বাড়ার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী হয়েছে। এটি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির জায়গা।
তরুণ উদ্যোক্তার অগ্রগতি:
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নবজাগরণে তরুণ উদ্যোক্তারা আজ এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি। তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রেক্ষাপটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, স্টার্টআপ বিস্তার ও ডিজিটালাইজেশন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আরও আশাব্যঞ্জক করে তুলেছে। সরকার, বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ ও শহরভিত্তিক উদ্যোক্তারা কৃষি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও সেবা খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। তবে আর্থিক সহায়তার অভাব, আইনি জটিলতা ও দক্ষ মানবসম্পদের সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলে উদ্যোক্তাদের সাফল্য আরও বাড়বে। টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক দায়িত্বের সমন্বয়ে উদ্যোক্তারা দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে।
সার্বিকভাবে, তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।
২০২৬ সালের দৃষ্টিপথ, সতর্ক আশাবাদ ও কঠিন বাস্তবতা:
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্দশা, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের সংকট। অন্যদিকে রয়েছে রিজার্ভের উন্নতি, প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার আশা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালে অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াবে—এমন দাবি করার সুযোগ এখনো নেই। তবে সঠিক নীতি, দৃঢ় সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা গেলে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হতে পারে। নতুন বছরের শুরুতে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—একটি নির্বাচিত সরকার, আস্থার পরিবেশ এবং সাহসী সংস্কার। এই তিনটি একসঙ্গে এগোতে পারলেই ২০২৬ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি মোড় ঘোরানো বছর হয়ে উঠতে পারে।




