সরকার জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত সঞ্চয় কর্মসূচির মুনাফার হার কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। স্কিমের ধরন অনুযায়ী নতুন মুনাফার হার ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এটি ১ জানুয়ারি থেকেই কার্যকর হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে মাসিক মুনাফা আগের চেয়ে ১১০ টাকা কমে যাবে। আগে পরিবার সঞ্চয়পত্রে এক লাখ টাকা রাখলে মাসে ৯৪৪ টাকা পাওয়া যেত। এখন তা দাঁড়িয়েছে ৮৩৪ টাকায়। এতে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ বাড়বে।
জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের আওতায় পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র এবং পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের হার নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড, ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড এবং ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সাধারণ হিসাবের মুনাফা আগের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমানো হয়েছে। নতুন নিয়মে বিনিয়োগকারীদের দুই ধাপে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ধাপের অন্তর্ভুক্ত ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচের বিনিয়োগকারীরা এবং দ্বিতীয় ধাপে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার ওপরের বিনিয়োগকারীরা।
মুনাফা কমানোর ফলে মেয়াদ শেষে ৭.৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে তা কমে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ হয়েছে। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে নগদায়নের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা বছরে ধাপে ধাপে মুনাফা পাবেন। প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি ৮ দশমিক ৮৩ থেকে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ, আর দ্বিতীয় ধাপের জন্য ৮ দশমিক ৭৪ থেকে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মুনাফা কমানোর ফলে পরিবার সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর মাসিক আয় কমবে। প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সুবিধা পাবেন, তবে দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগকারীরাও মেয়াদ শেষের আগে নগদায়ন করলে পর্যায়ক্রমে মুনাফা পাবেন।
পরবর্তী সময়ে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র এবং পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিটের মুনাফার হারও বিনিয়োগ ধাপ অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ৭.৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষে হার দাঁড়াবে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে নগদায়নের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা প্রথম বছরে ৯ দশমিক ৫৪, দ্বিতীয় বছরে ১০ এবং তৃতীয় বছরে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগকারীরা প্রথম বছরে ৯ দশমিক ৫০, দ্বিতীয় বছরে ৯ দশমিক ৯৫ এবং তৃতীয় বছরে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন।
পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রেও মুনাফার হার কমানো হয়েছে। ৭.৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে নগদায়নের ক্ষেত্রে প্রথম বছরে ৮ দশমিক ৭৬, দ্বিতীয় বছরে ৯ দশমিক ১৫, তৃতীয় বছরে ৯ দশমিক ৫৫, চতুর্থ বছরে ৯ দশমিক ৯৮ এবং পঞ্চম বছরে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগকারীরা প্রথম বছরে ৮ দশমিক ৭৪, দ্বিতীয় বছরে ৯ দশমিক ১২, তৃতীয় বছরে ৯ দশমিক ৫৩, চতুর্থ বছরে ৯ দশমিক ৯৬ এবং পঞ্চম বছরে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। এভাবে মুনাফা কমানো সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আয় কমাবে এবং যারা এই সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাসিক বাজেটে চাপ বৃদ্ধি পাবে।
পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগ থাকলে মেয়াদ শেষে মুনাফা ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে হার কমে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে নগদায়নের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা প্রথম বছরে ৮ দশমিক ৮৭, দ্বিতীয় বছরে ৯ দশমিক ২৬, তৃতীয় বছরে ৯ দশমিক ৬৮, চতুর্থ বছরে ১০ দশমিক ১২ এবং পঞ্চম বছরে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগকারীরা যথাক্রমে ৮ দশমিক ৭৪, ৯ দশমিক ১২, ৯ দশমিক ৫৩, ৯ দশমিক ৯৬ এবং ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন।
পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিটে পরিবর্তন:
মুনাফার হার কমানো হয়েছে পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিটেও। তিন বছরের মেয়াদ শেষে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফা ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ, আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে হার কমে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশে নেমেছে।
মুনাফা কমানোর ফলে পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র ও পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিটে বিনিয়োগকারীদের আয় কমবে। বিশেষ করে যারা এই সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাসিক বাজেটে চাপ বাড়তে পারে। সরকার এই পরিবর্তন ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করেছে, এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ ধাপ অনুযায়ী মুনাফা ভিন্ন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
মুনাফা কমানো সঞ্চয়পত্রসমূহ: সরকার এবার নিম্নলিখিত সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হারের পরিবর্তন করেছে—
- পরিবার সঞ্চয়পত্র
- তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র
- পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র
- পেনশনার সঞ্চয়পত্র
- পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিট
তবে ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড, ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড এবং ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সাধারণ হিসাবের মুনাফা আগের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
জাতীয় সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগ ধাপ ও মুনাফা হার:
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের জনপ্রিয় সঞ্চয়পত্রগুলোতে নতুন নিয়মে বিনিয়োগকারীদের দুটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে আছেন ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচে বিনিয়োগকারী এবং দ্বিতীয় ধাপে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার ওপর বিনিয়োগকারী। বিনিয়োগের পরিমাণ অনুযায়ী মুনাফার হারও কিছুটা ভিন্ন হবে।
পরিবার সঞ্চয়পত্রে নতুন হার:
- ৭.৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা: ১০.৫৪%
- ৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা: ১০.৪১%
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙলে বছরে বছরে মুনাফা ধাপে ধাপে বাড়বে, তবে আগের তুলনায় কিছুটা কম থাকবে।
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র:
- ৭.৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা: ১০.৪৮%
- ৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা: ১০.৪৩%
পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র:
- ৭.৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা: ১০.৪৪%
- ৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা: ১০.৪১%
পেনশনার সঞ্চয়পত্র:
- ৭.৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা: ১০.৫৯%
- ৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা: ১০.৪১%
পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিট:
- তিন বছরের মেয়াদ শেষে ৭.৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফা: ১০.৪৮%
- ৭.৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা: ১০.৪৩%
নগদায়ন আগে মুনাফার হার: প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে নগদায়নের ক্ষেত্রে পাবেন:
- প্রথম বছরে: ৯ দশমিক ৫৪%
- দ্বিতীয় বছরে: ১০%
- তৃতীয় বছরে: ১০ দশমিক ৪৮%
দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগকারীরা পাবেন:
- প্রথম বছরে: ৫ দশমিক ৫০%
- দ্বিতীয় বছরে: ৯ দশমিক ৯৫%
- তৃতীয় বছরে: ১০ দশমিক ৪৩%
নতুন হার কতদিন কার্যকর:
এই নতুন মুনাফার হার চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। ছয় মাস পর আবার মুনাফা হার পুনঃনির্ধারণ করা হবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যারা ইস্যু করার সময় সঞ্চয়পত্র কিনবেন, তারা পুরো মেয়াদজুড়েই ইস্যুকালীন মুনাফার হার পাবেন। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির আগে ইস্যু করা সঞ্চয়পত্রে আগের হারই প্রযোজ্য হবে। পুনঃবিনিয়োগ করলে তখনকার নতুন হার কার্যকর হবে, যা এই ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ৪৩%।
নতুন হার বিনিয়োগকারীদের মাসিক আয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে যারা পেনশনার সঞ্চয়পত্র বা পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিটের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাসিক বাজেটে সামঞ্জস্য করতে হতে পারে। সরকার জানিয়েছে, নতুন হার জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত কার্যকর, এবং ছয় মাস পর পুনঃমূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন হার নির্ধারণ করা হবে।

