এক দশকেরও বেশি সময় আগে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছিল বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো একদিন দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিল পরিশোধ, টাকা পাঠানো, এমনকি সঞ্চয়—সবকিছুই এখন মোবাইল ফোনের পর্দায় এসে ধরা দিয়েছে। নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমে এসেছে চোখে পড়ার মতোই।
প্রযুক্তির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বয়সভেদে আলাদা হয়—এটা জানা কথা। কিন্তু ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক আশ্চর্য মিল দেখা যাচ্ছে। বয়স যতই হোক, ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশই এই সেবাগুলো নিয়ে ইতিবাচক।
আব্দুল রাকিব, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী, ২০১৭ সালের শেষ দিক থেকে বিকাশ ব্যবহার করছেন। শুরুতে সংশয় থাকলেও এখন তাঁর অভিজ্ঞতা পুরোপুরি উল্টো। তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে তাঁর ছেলে একাই জুতা কিনতে গিয়েছিল। সঙ্গে নগদ টাকা না থাকলেও সমস্যা হয়নি। দোকান থেকে ফোন করে বাবাকে জানালেই বিকাশে পেমেন্ট হয়ে যায়। “এত সহজে কাজ হয় বলেই এখন আর আগের সেই ঝামেলার কথা মনে পড়ে না,”—বলছিলেন তিনি।
এই সহজতা আর নিরাপত্তাই মানুষকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করছে। বয়সের ব্যবধান থাকলেও সুবিধাগুলো নিয়ে মতামতে খুব বেশি পার্থক্য নেই। কলেজ শিক্ষার্থী বোরহান নূর বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার পরপরই তিনি বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। এখন দৈনন্দিন সব খরচই সেখান থেকেই। টাকার দরকার হলে বাবাকে ফোন করে পাঠিয়ে নিতে পারেন মুহূর্তেই। তাঁর মতে, পুরোপুরি ডিজিটাল লেনদেনে চলে যাওয়াই ভবিষ্যৎ। “পকেটে টাকা না রাখলেও যদি সব কাজ করা যায়, সেটাই তো বেশি নিরাপদ,”—বলছিলেন তিনি।
আরেকটু দূরের ভবিষ্যৎ দেখছেন সিনিয়র সার্জন মিজানুর রহমান। তাঁর বিশ্বাস, এক সময় বাসে ওঠার ভাড়াও ডিজিটাল মাধ্যমে দিতে হবে। নগদ টাকার ব্যবহার ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রশ্নে অধিকাংশ মানুষের উত্তরই ছিল একই রকম আশাবাদী।
ডিজিটাল ওয়ালেটের ওপর আস্থা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারকারীরা এখন শুধু টাকা পাঠানো বা বিল দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। বয়সভেদে ব্যবহার বদলাচ্ছে। প্রবীণ ও মধ্যবয়সীদের কাছে ডিজিটাল সঞ্চয় প্রকল্প বা ডিপিএস হয়ে উঠেছে বড় সুবিধা।
মেহ্রুননেসা জানান, মাসে মাসে ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে কিস্তি জমা দেওয়া ছিল তাঁর জন্য বিরক্তিকর। এখন অ্যাপের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব হয়ে যায়। ব্যাংকের সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেও ঘরে বসেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় পুরো বিষয়টি। এই নিশ্চিন্ততা ও সহজ ব্যবস্থাই প্রবীণদের কাছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে আলাদা করে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
অন্যদিকে তরুণদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তাৎক্ষণিক ছোট ঋণ বা ‘ন্যানো লোন’। পড়াশোনা বা চাকরির শুরুতে সীমিত আয়ের মধ্যে হঠাৎ খরচ সামলাতে এই সুবিধা অনেকের জন্য বড় ভরসা। আমরিন জানান, তাঁর এক বন্ধুর সেমিস্টার ফি জমা দেওয়ার শেষ দিনে টাকা কম পড়ে গিয়েছিল। কোনো কাগজপত্র ছাড়াই অ্যাপ থেকে ছোট অঙ্কের ঋণ নিয়ে কাজ সেরে ফেলেছিল সে, পরে সময়মতো পরিশোধও করেছে। প্রবীণরা যেখানে ডিজিটাল ওয়ালেটকে ব্যাংকের বিকল্প শাখা হিসেবে দেখছেন, তরুণরা সেখানে একে দেখছেন জরুরি সময়ের নিরাপত্তা জাল হিসেবে।
তবে সব অভিজ্ঞতা যে সুখকর, তা নয়। কিছু ব্যবহারকারী প্রতারণার শিকারও হয়েছেন। প্রতারকরা কখনো কাস্টমার কেয়ারের পরিচয় দিয়ে, কখনো ভয় দেখিয়ে পিন বা কোড আদায় করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
ব্যবসায়ী হাসানের অভিজ্ঞতা এখনো তাঁকে নাড়া দেয়। ২০১৯ সালে হঠাৎ ফোন পেয়ে তিনি শুনলেন, তাঁর বিকাশ নম্বর নাকি ব্লক হয়ে গেছে। ভয় পেয়ে তিনি ফোনে পাওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কোড ও পিন শেয়ার করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় ৩০ হাজার টাকা উধাও হয়ে যায়। “নিজের অসাবধানতার মূল্যটা খুব কষ্ট করে বুঝেছি,”—বলছিলেন তিনি।
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের এই সম্ভাবনাময় খাতকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে কয়েকটি বিষয় জরুরি হয়ে উঠছে। প্রথমত, আর্থিক সচেতনতা বাড়ানো। এখনো অনেক মানুষ এসব সেবা পুরোপুরি কাজে লাগাতে জানেন না। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো আরও জোরদার করা, যেন প্রতারণার সুযোগ কমে আসে। পাশাপাশি ঋণ ও বিনিয়োগ সেবাগুলো আরও পরিণত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।
সব মিলিয়ে ব্যবহারকারীদের বড় অংশই ডিজিটাল ওয়ালেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। নগদ টাকার বাইরে গিয়ে যে একটি ক্যাশলেস বাংলাদেশের পথ তৈরি হচ্ছে, তা ধীরে হলেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

