সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালের শেষ মাস ডিসেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি টানা দুই মাস বাড়ার পরিমাণ ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এর আগে নভেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। গত বছরের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা আগের বছরের ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশের তুলনায় কম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) ও শিল্প উৎপাদন সূচক (আইআইপি) প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩১ জুলাই ঘোষিত মুদ্রানীতিতে ২০২৬ সালের জুন মাস নাগাদ গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বিবিএস প্রতি মাসে মাঠ পর্যায় থেকে ৬৪ জেলার ১৫৪টি হাটবাজার থেকে পণ্য ও সেবার তথ্য সংগ্রহ করে। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যস্ফীতি নির্ণয় করা হয়। চলন্ত ১২ মাসের গড় হিসাবকে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি বলা হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর ধরে সম্প্রতি পদ্ধতি হালনাগাদ করা হয়েছে। সিপিআই-তে এখন ৭৪৯ ধরনের ৩৮৩ আইটেম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মদ, সিগারেট, বেভারেজ, মাদকদ্রব্য, সন্তানের শিক্ষা, ইন্টারনেট, রেস্টুরেন্ট ও হোটেল খরচ।
বছরের মাসওয়ারি মূল্যস্ফীতির গতি:
পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ২০২৫ সালের মাসওয়ারি মূল্যস্ফীতি ছিল ওঠানামা যুক্ত। জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, গড় ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশে ছিল। ফেব্রুয়ারিতে কমে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, গড় ১০ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে আসে। মার্চে সামান্য বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ হলেও গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ২৬ শতাংশে থাকে।
এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এপ্রিল ৯ দশমিক ১৭, মে ৯ দশমিক শূন্য ৫ ও জুন ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গড় মূল্যস্ফীতিও কমতে থাকে যথাক্রমে ১০ দশমিক ২১, ১০ দশমিক ১৩ ও ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। জুলাইয়ে কিছুটা বেড়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে আসে। তবে গড় নিম্নমুখী ধারাই অব্যাহত থাকে। আগস্টে আবার ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমে যায়। সেপ্টেম্বর ৮ দশমিক ৩৬, অক্টোবর ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। নভেম্বরে ৮ দশমিক ২৯ ও ডিসেম্বরে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে পৌঁছায়।
খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে ভোগান্তি:
বিবিএস তথ্য অনুযায়ী, বছরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি। জানুয়ারিতে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ৯ দশমিক ৩২। এপ্রিল থেকে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম খাদ্যের চেয়ে দ্রুত বেড়ে, ডিসেম্বরে খাদ্য ৭ দশমিক ৭১, খাদ্যবহির্ভূত ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজির হোসেন বলেন, ‘ভোক্তার প্রত্যাশা অনুযায়ী নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে না থাকার বড় কারণ হচ্ছে সুশাসনের অভাব। বছরের শেষের দিকে চাঁদাবাজি বেড়েছে, যার কারণে নিত্যপণ্যের দাম কমানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে চালের দাম সারাবছর কারসাজির মাধ্যমে বাড়ানো হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু দেশে এটি কার্যকর হচ্ছে না। দেশে মূল্যস্ফীতি নভেম্বর ও ডিসেম্বরে বাড়ছে, পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ডিসেম্বরে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বাংলাদেশে ডলার সংকট কিছুটা কমলেও, রিজার্ভ বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল বিনিময় হারের পরেও দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশ্ববাজারে ২০২৫ সালে জ্বালানি তেল, চাল, গম, সয়াবিন তেল, গুঁড়া দুধ, মসলা সহ বেশিরভাগ ভোগ্যপণ্যের দাম কমেছে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও কমেছে। তবে দেশের বাজারে দাম কমেনি, বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে ও সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তা কার্যকর হয়নি। উল্টো সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে গেছে। বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত, কর্মসংস্থান কমেছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি ও বাজারে মাফিয়া গোষ্ঠীর প্রভাব থেকে তৈরি হচ্ছে।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘ভারতে মূল্যস্ফীতি ১ শতাংশের নিচে, শ্রীলংকায় ঋণাত্মক ধারায়, পাকিস্তানেও ৬ শতাংশের নিচে। অথচ বাংলাদেশে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমেনি। সরকারের মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন করেছে।’
বাজারের বাস্তব চিত্র:
বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘৬৪ জেলার বাজার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে মূল্যস্ফীতি যাচাই করি। ডিসেম্বরে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম সামান্য বেড়েছে। তবে আগের বছরের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কম।’ বাজার সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, সবজি, চাল, ডাল, চিনি, আটা, মাছ-মাংস ও এলপিজি সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বছরের অধিকাংশ সময় বেড়েছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে সবজির দাম বেশি ছিল, কৃষক পর্যায়ে দাম কমলেও ক্রেতা পর্যায়ে তার সুফল পৌঁছায়নি।
সেলিম রায়হান, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি সামান্য ওঠানামা করছে, তবে স্থায়ী পরিবর্তন নেই। সরকার সুদহার বাড়িয়ে চাহিদা কমানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু নীতিগত সমন্বয়, বাজার কাঠামো ও বহিরাগত ঝুঁকির কারণে স্থায়ী মূল্যস্থিতি তৈরি হয়নি। কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রতিযোগিতার অভাব সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে তীব্র করেছে। এজন্য আর্থিক নীতি ছাড়া শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য।’

