বাংলাদেশের শ্রমবাজার গভীর বৈপরীত্যে দাঁড়িয়ে আছে। সরকারি পরিসংখ্যানে বেকারত্ব কম, শ্রমশক্তির আকার বড় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাজের মান খারাপ, নিরাপত্তা নেই, নারীরা শ্রমবাজার থেকে সরে যাচ্ছেন এবং তরুণদের বড় অংশ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় আটকা পড়েছে।
২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ (১৩তম আইসিএলএস অনুযায়ী) শুধু সংখ্যা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, উন্নয়ন মডেল এবং সামাজিক কাঠামোর এক আয়না। এই আয়নায় দেখা যায়– শ্রমবাজারে ‘স্থিতিশীলতা’ যে দেখা যাচ্ছে, তা মূলত কাঠামোগত সঙ্কট ঢেকে রাখার একটি পরিসংখ্যানগত আবরণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শ্রমশক্তি জরিপ স্পষ্ট করে জানাচ্ছে– বাংলাদেশের শ্রমবাজারে সংখ্যাগত স্থিতি আছে, কিন্তু কাঠামোগত সুস্থতা নেই। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন– শিল্প ও উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান, নারী ও যুবদের জন্য নিরাপদ ও লক্ষ্যভিত্তিক কাজ, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমকে ধাপে ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা, এবং সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রম অধিকার কার্যকর করা। ২০২৬ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে শ্রমবাজার সংস্কার এখন নীতিগত বিলাসিতা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় টিকে থাকার শর্ত।
শ্রমশক্তির বিস্তার, কিন্তু অংশগ্রহণ কমছে:
২০২৪ সালে বাংলাদেশের জাতীয় শ্রমশক্তি দাঁড়িয়েছে ৭৩.৪৫ মিলিয়নে। এক দশক আগের তুলনায় এটি অনেক বড় সংখ্যা। স্বাভাবিকভাবে ধরে নেওয়া যায়– এত বড় শ্রমশক্তি অর্থনীতির জন্য শক্তিশালী একটি সম্পদ। কিন্তু পরিসংখ্যানই প্রথম বড় সতর্কতা জানাচ্ছে।
শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার নেমে এসেছে ৫৮.৯ শতাংশে। তুলনামূলকভাবে, ২০২২ সালে হার ছিল ৬১.২ শতাংশ। অর্থাৎ, কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠী বেড়েছে, কিন্তু তাদের বড় অংশ কাজের বাজারে প্রবেশ করছে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কাজে নিরুৎসাহিত কর্মীবাহিনীর ইঙ্গিত। মানুষ কাজ না পেয়ে বা উপযুক্ত কাজ না দেখে কাজ খোঁজা বন্ধ করছে। এটি কোনো স্বাস্থ্যকর শ্রমবাজারের লক্ষণ নয়।
নারীর শ্রমবাজার থেকে সরে যাওয়া:
শ্রমবাজারের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো নারীদের অংশগ্রহণ। ২০২৩ সালে নারী শ্রমশক্তি ছিল ২৫.৩৩ মিলিয়ন, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ২৩.৬৯ মিলিয়নে। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮.৪ শতাংশে। এটি শুধু পরিসংখ্যানে ওঠানামা নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক পশ্চাদপসরণের সংকেত।
মুদ্রাস্ফীতি, পরিবহন সমস্যা, কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা এবং ডে-কেয়ার ও যত্ন-অবকাঠামোর অভাব মিলিয়ে শ্রমবাজার ক্রমেই নারীদের জন্য অনুপযোগী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত ও সেবা খাতে কাজের চাপ বেড়েছে, কিন্তু কর্মপরিবেশ ও মজুরি কাঠামো নারীবান্ধব হচ্ছে না। ফলে, যারা এক দশক ধরে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছিলেন, তাদের বড় অংশ আবার গৃহস্থালি ও অবৈতনিক কাজে ফিরে যাচ্ছেন।
কর্মসংস্থান কমছে, চাকরিহীন প্রবৃদ্ধির বাস্তবতা
২০২৪ সালে মোট কর্মে নিয়োজিত জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৯.০৯ মিলিয়নে। এটি আগের বছরের তুলনায় কম। অথচ সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। এই বৈপরীত্যই নির্দেশ করছে– বাংলাদেশ চাকরিহীন প্রবৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে।
পুরুষদের কর্মসংস্থান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও, নারীদের কর্মসংস্থান কমে এসেছে ২২.৮৭ মিলিয়নে। অর্থাৎ, নতুন কাজগুলো হয় অল্পমেয়াদি, নয়তো নারীদের জন্য অনুপযোগী। এটি একটি কাঠামোগত সঙ্কট– অর্থনীতি বড় হচ্ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি নেই।
বেকারত্ব কম, কিন্তু বাস্তব চাপ বেশি:
২০২৪ সালে জাতীয় বেকারত্বের হার ৩.৬৬ শতাংশ। এই সংখ্যা দেখে অনেকেই মনে করতে পারেন– বেকারত্ব নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু শ্রমশক্তি জরিপের ভেতরের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৪ সালে প্রায় ৪৭ মিলিয়ন মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে। এদের বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সী। অর্থাৎ, বেকারত্ব কম দেখাচ্ছে কারণ বিপুল মানুষকে গণনাতেই আনা হয়নি। বিশেষ করে শহরে বেকারত্বের হার ৮.৮ শতাংশ, যা গ্রামীণ এলাকার তুলনায় অনেক বেশি। শহরমুখী শিক্ষিত তরুণরা কাজ না পেয়ে হতাশ হচ্ছে। কেউ কেউ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছে, কেউ অনানুষ্ঠানিক ও অনিশ্চিত কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান, শিল্পায়নের ব্যর্থতা:
২০২৪ সালে বাংলাদেশের খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান চিত্র দেশের উন্নয়ন মডেলের দুর্বলতা স্পষ্ট করে। মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে কৃষি খাতের অংশ ৪৮.৪৯ শতাংশ, শিল্প খাত ১৭.২৬ শতাংশ এবং সেবা খাত ৩৭.৯৬ শতাংশ।
স্বাভাবিকভাবে, উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে কৃষির অংশ কমে শিল্প ও সেবার অংশ বাড়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে– কৃষিতে কর্মসংস্থান বাড়ছে। এটি কোনো সাফল্য নয়। বরং নির্দেশ করছে– শিল্প ও নগরমুখী কাজ সঙ্কুচিত হওয়ায় মানুষ আবার কম উৎপাদনশীল কৃষিতে ফিরে যাচ্ছে। শিল্প খাতে কর্মসংস্থান স্থবির থাকা মানে উৎপাদনশীলতা, রফতানি বৈচিত্র্য এবং দক্ষতার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি, শ্রমবাজারের প্রকৃত চেহারা:
২০২৪ সালে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের আধিপত্য। মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৮ শতাংশ এই খাতের অধীনে। গ্রামীণ এলাকায় প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং শহরে ৭৩.৭৭ শতাংশ। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রম মানে– কোনো লিখিত চুক্তি নেই, সামাজিক সুরক্ষা নেই, ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নেই। এটি একটি অর্থনৈতিক ধাক্কা, যা শ্রমিকদের মুহূর্তে দারিদ্র্যের নিচে ঠেলে দিতে পারে।
যুব শ্রমশক্তি:
বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর কথা বলেছে। কিন্তু শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ দেখাচ্ছে– এই সুযোগ দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে। ১৫–২৯ বছর বয়সী যুব শ্রমশক্তি নেমে এসেছে ২৪.৮৩ মিলিয়নে। ১৫–২৪ বছর বয়সী শ্রমশক্তির পতন আরো ধারাবাহিক। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সংযোগ না থাকায় তরুণরা দক্ষতা অর্জন করছে না, আবার কাজও পাচ্ছে না। এর সামাজিক ফলাফল ভয়াবহ– হতাশা, অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে।
টিকে থাকার অর্থনীতি, পেশাগত মর্যাদার বাস্তবতা:
২০২৪ সালে কর্মসংস্থানের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়– নিজস্ব ব্যবসা বা স্বকর্মে নিয়োজিত ৩৫.৭৬ মিলিয়ন, কর্মচারী ২৬ মিলিয়ন এবং নিয়োগকর্তা মাত্র ২.৯ মিলিয়ন। এটি উদ্যোক্তা অর্থনীতির শক্তি নয়। এটি মূলত একটি বেঁচে থাকার অর্থনীতি, যেখানে মানুষ চাকরি না পেয়ে বাধ্য হয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা বা অনানুষ্ঠানিক কাজে নামছে। আয় অনিশ্চিত এবং ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়।
অবৈতনিক পারিবারিক শ্রম:
২০২৪ সালে অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিকের সংখ্যা ৮.৮ মিলিয়ন, যার বড় অংশ নারী। এই শ্রম অর্থনীতির পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। কিন্তু সমাজ ও শ্রমবাজার টিকিয়ে রাখতে এটি অপরিহার্য। এই শ্রমকে অদৃশ্য রাখার মানে– নারীর অবদানকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে অস্বীকার করা।
বেকারত্ব কম দেখাচ্ছে, কিন্তু বাস্তব চাপ বেশি:
২০২৪ সালে জাতীয় বেকারত্বের হার সরকারি হিসাবে ৩.৬৬ শতাংশ। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে– বেকারত্ব নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু শ্রমশক্তি জরিপের বিস্তারিত তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। প্রায় ৪৭ মিলিয়ন মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে। এদের বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সী। তাই বেকারত্ব কম দেখাচ্ছে, কিন্তু বাস্তব চাপ বেশি।
কারণগুলো হলো:
-
বেকার হিসেবে গণনার শর্ত কঠোর: বাংলাদেশে বেকার হিসেবে গণ্য হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়– রেফারেন্স সপ্তাহে এক ঘণ্টাও কাজ করেননি, কাজ করতে সক্ষম ও আগ্রহী, এবং গত চার সপ্তাহে সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজেছেন। এই শর্ত পূরণ না হলে কেউ সরকারি হিসাবে বেকার নন। ফলে বহু মানুষ– বিশেষ করে দীর্ঘদিন কাজ না পেয়ে হাল ছেড়ে দেয়া তরুণরা– গণনায় আসে না।
-
নিরুৎসাহিত কর্মীরা গণনার বাইরে: অনেক মানুষ কাজ করতে চায় কিন্তু মনে করে– ‘কাজ নেই’। তাই তারা আর আবেদন করে না। এই জনগোষ্ঠী শ্রমশক্তির বাইরে ধরা হয়। বাস্তবে তারা বেকার, কিন্তু পরিসংখ্যানে নেই।
-
আধা-বেকারত্ব ধরা হয় না: সপ্তাহে অল্প সময় কাজ করা মানুষ– যেমন ১০–১৫ ঘণ্টা–কেও কর্মে নিয়োজিত ধরা হয়। তারা পূর্ণকালীন কাজ চাইলেও পরিসংখ্যানে বেকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় না।
-
অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অস্থায়ী কাজও ‘কর্মসংস্থান’: রিকশা চালানো, দিনমজুরি, খণ্ডকালীন অনিয়মিত কাজ– সবই সরকারি হিসেবে কর্মসংস্থান। কিন্তু বাস্তবে এই কাজ অনিশ্চিত, আয়ের পরিমাণ কম এবং সামাজিক সুরক্ষা নেই। ফলে মানুষ কাজ করলেও নিরাপত্তা নেই, কিন্তু বেকারও নয়।
-
নারীদের বড় অংশ শ্রমশক্তির বাইরে: অনেক নারী কাজ করতে সক্ষম হলেও সামাজিক বাধা, নিরাপত্তাহীনতা বা যত্নের কারণে শ্রমবাজারে নেই। তাদের বেকারত্ব পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না।
-
শিক্ষার্থী কিন্তু কাজ-ইচ্ছুক তরুণরা বাদ পড়ে: পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে ইচ্ছুক অনেক যুবক যদি সক্রিয়ভাবে কাজ না খুঁজেন, তারা সরকারি হিসাবে বেকার নন। ফলে যুবদের কর্মসংস্থান সমস্যা আড়ালে থাকে।
-
কম হার, কিন্তু মানুষ বেশি বাইরে: শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় বেকারত্বের হার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায়। ২০২৪ সালে প্রায় ৪৭ মিলিয়ন মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে। এটাই বেকারত্ব কম দেখানোর বড় কারণ।
কোন সূচক দেখলেই বাস্তব বোঝা যায়: শুধু বেকারত্বের হার নয়, একসাথে দেখতে হবে– শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার, শ্রমশক্তির বাইরে জনসংখ্যা, যুব ও নারী অংশগ্রহণ, আধা-বেকারত্ব এবং কাজ, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণ। এই সূচকগুলো একসাথে বিশ্লেষণ করলে শ্রমবাজারের প্রকৃত চাপ বোঝা যায়।
কম বেকারত্বের হার মানে কম সঙ্কট নয়। বরং এটি নির্দেশ করে– সঙ্কটের বড় অংশ পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এখন আর শুধু বেকারত্বের হার নয়, কাজের গুণমান, নিরাপত্তা এবং অংশগ্রহণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

