দেশে এলপিজির সংকট তীব্র আকার নিচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ ও এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠকের পরও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
অন্যদিকে, মূল্য সমন্বয় না করা এবং ‘হয়রানি-জরিমানা’ বন্ধের দাবির প্রতি গুরুত্ব না দেওয়ায় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড আজ থেকে সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। সমিতির দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই স্থবিরতা চলবে। গতকাল সন্ধ্যায় দেশের সব পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার জন্য নোটিশ জারি করে সমিতি। নোটিশে বলা হয়েছে, সব কোম্পানির প্লান্ট থেকে এলপিজি উত্তোলনও বন্ধ থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে এলপিজি সরবরাহ সংকট দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ক্রয়াদেশ দিয়ে পণ্য দেশের বাজারে আনার জন্য অন্তত ছয় সপ্তাহ সময় লাগে। এর সঙ্গে জাহাজ সংকট, ভাড়া বৃদ্ধি এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাও যুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান সংকট আকস্মিকভাবে তৈরি হয়নি। বরং দীর্ঘ সময় ধরে আমদানি বৃদ্ধির অনুমোদন না পাওয়া, বিশ্ববাজারে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা, অপারেটরের সংকট এবং বাজারের বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আমদানির বন্ধের কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
দেশের বাজারে প্রতি বছর যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়, তার প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ হয়। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, শ্রীলংকা ও ভারতের ওড়িশা, ধামরা সমুদ্রবন্দর দিয়ে অন্তত ৭০ হাজার টন গ্যাস আসে। বাকি ৫০ হাজার টন বিশ্বের বিভিন্ন অপারেটর ও ইরানের বন্দরের মাধ্যমে আনা হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ৫০ হাজার টন এলপিজি বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে বিকল্প সরবরাহকারী না থাকলে এবং দেশের বাজারে ৫০ হাজার টনের বিকল্প উৎস তৈরি না হলে সামনের দিনগুলোতে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় আমদানিকারকরা। এক বছর আগে দেশের অন্তত ২৭টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করত। বর্তমানে মূলত মাত্র পাঁচটি অপারেটর এলপিজি আমদানি করছে, জানিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতি।
দেশের বাজারে সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার থাকলেও এখন রিফিল হচ্ছে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার। সমিতির হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৪ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার ব্যবহারযোগ্য থাকলেও খালি পড়ে আছে। এই খালি সিলিন্ডারের বড় অংশের মালিক তারা, যারা আর এলপিজি আমদানি করছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, এসব কোম্পানির আমদানি বন্ধ করা এ খাতে সংকটের অন্যতম কারণ।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বলছে, দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করে। এর মধ্যে ২৩টিরই আমদানি অনুমোদন আছে। তবু এখন মূলত পাঁচটি কোম্পানি আমদানি করছে, বাকিদের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। কিছু কোম্পানির ব্যবসা বন্ধের পথে এবং অনেক কোম্পানি ব্যাংক ঋণ শোধেও হিমশিম খাচ্ছে। এ পরিস্থিতি সরবরাহ সংকট বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে, সক্রিয় কিছু কোম্পানি আমদানি বাড়াতে চেয়েও দীর্ঘদিন সরকারের অনুমতি পায়নি।
গত নভেম্বরে দেশে এলপিজি আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার টন। ডিসেম্বরে এটি বেড়ে ১ লাখ ২৭ হাজার টন হয়েছে। আমদানি বৃদ্ধির পরও কেন বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কিছু ব্যবসায়ী বলছেন, বিশ্ববাজারের মূল্য সূচক থেকে অনেকে এক মাস আগে এলপিজির দাম আন্দাজ করতে পারেন। ফলে পরিবেশক ও ডিলারের বড় অংশ বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নেয়। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তারা পরিবেশকের কাছ থেকে কেনার দামের চেয়ে মাত্র ৫০–১০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন।
শীতকালে পাইপলাইনের গ্যাস চাপ কম থাকায় অনেক বাসায় বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা এটিকেই আকস্মিক এলপিজি সংকটের বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে কিছু ব্যবসায়ী মনে করছেন, সরবরাহের যে চিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়।
সংকট নিরসনে রোববার জ্বালানি বিভাগ অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এলপিজি আমদানির সীমা বাড়ানো, এনবিআরের শুল্ক ও ভ্যাট সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান চেয়ে গতকাল চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমদানি ও মজুদ সংক্রান্ত কোনো জটিলতা বা সিন্ডিকেট হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে দুটি টিম কাজ করছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এলপিজি সংকট নিয়ে আমরা লোয়াবের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা আমদানিতে যে প্রতিবন্ধকতার কথা জানিয়েছিলেন, তা সমাধান করা হচ্ছে। ভ্যাট ও শুল্কের বিষয়েও তারা আমাদের জানিয়েছে। আমরা এনবিআরকে চিঠি পাঠাচ্ছি, যাতে দ্রুত সমাধান হয়। এছাড়া আমদানি ও মজুদ সংক্রান্ত বিষয় তদারকি করার জন্য জ্বালানি বিভাগের দুটি টিম চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর পরিদর্শন করেছে। অপারেটররা যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে দেশে এই সংকট হওয়ার কথা নয়। আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। যত দ্রুত সম্ভব সংকটের সমাধান করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শীত মৌসুমে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়, পাইপলাইনে গ্যাসের চাপের জটিলতার বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার এবং বাজার থেকে অনেক অপারেটরের সরে যাওয়া এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।’
এ বিষয়ে লোয়াবের সভাপতি ও ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘এলপিজি সংকট নেই, এমন বলা ঠিক নয়। সংকট আছে, তবে বেশি দামে বিক্রি করার সুযোগও নেই। বাজারে তাও হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা বৈঠক করেছি। সংকট কমানোর জন্য এলপিজি আমদানির সীমা বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে চাইলেই তাৎক্ষণিকভাবে পণ্য আমদানি সম্ভব নয়। অন্তত ৪৫ দিন সময় লাগে। এছাড়া জাহাজ সংকট এবং বাড়তি ভাড়াও রয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিলে আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।’
দেশে এলপি গ্যাসের সংকট দুই পক্ষের—অপারেটর ও এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির—বিপরীতমুখী দাবির কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। গতকাল সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশকদের সঙ্গে আলোচনা করে পুনরায় এলপি গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
সংকট ভোক্তা, পরিবেশক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে। সমবায় সমিতির অভিযোগ, সংকটের মূল কারণ সমাধান না করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বাজারে মূল্য নির্ধারণ করায় বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের বলা, এলপিজির মূল্য নির্ধারণে বিভিন্ন সময় জটিলতা তৈরি হলে সমিতি একাধিকবার বিইআরসিকে চিঠি দিয়েও আলোচনা করতে পারেনি।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে বিইআরসির সীমাবদ্ধতা আছে। তবে এলপিজি সরবরাহ বাড়াতে অপারেটরদের জানানো হবে। সংকট নিরসনে অপারেটর ও সমবায় সমিতির নেতাদের সঙ্গে আজ বৈঠক হবে। হঠাৎ করে সমবায় সমিতির ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
প্রসঙ্গত, প্রতি মাসে এলপিজির মূল্য সমন্বয় করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি নতুন মূল্য ঘোষণা করা হয়। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি বলছে, কমিশন পরিবেশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে মূল্য সমন্বয় করেছে। তাদের অভিযোগ, সংকট দূর করতে জোর না দিয়ে বাড়তি দাম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।
দেশের বাজারে বড় আকারে এলপি গ্যাস সরবরাহ করছে ফ্রেশ এলপি গ্যাস লিমিটেড। মেঘনা গ্রুপের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানটির আড়াই লাখ টন আমদানি সক্ষমতা রয়েছে। তারা নতুন করে আরও এক লাখ টন আমদানি বাড়াতে চায়। জ্বালানি বিভাগের অনুমোদন পেলে দ্রুত আমদানির কার্যক্রম শুরু করা হবে। কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীরা মনে করেন, বিদ্যমান সংকটের পেছনে আমদানি সক্ষমতা বৃদ্ধির অনুমোদন ঝুলে থাকা বড় কারণ।
ফ্রেশ এলপি গ্যাসের চিফ মার্কেটিং অফিসার আবু সাঈদ রাজা বলেন, ‘আমরা দুই বছর আগে মন্ত্রণালয়ে অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলাম। বগুড়া প্লান্টের জন্য ৬০ হাজার টন এবং মোংলা প্লান্টের জন্য ৯০ হাজার টন চাওয়া হয়েছিল। এতদিন অনুমোদন হয়নি। এখন সৃষ্ট সংকটের কারণে এই প্রস্তাব অনুমোদনের আশ্বাস দেয়া হয়েছে। যদি আগেই অনুমোদন দেয়া হতো, হয়তো বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।’
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সেলিম খান বলেন, ‘গত ২০ বছরে এমন সংকট দেখা যায়নি। ২৭টি অপারেটরের মধ্যে মাত্র পাঁচটি গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বলে দাবি হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা বিষয়টির সমাধান চাই। বিইআরসির চেয়ারম্যান আমাদের ডেকে বৈঠক করেছেন, আজ বেলা ৩টায় এটি নিয়ে আলোচনা হবে।’

