জাতীয় নির্বাচন নির্ধারিত সময়মতো অনুষ্ঠিত হলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রমজানের চড়া বাজারদর সামলানোর কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া কিছু নীতি ও পদক্ষেপও আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্য আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
নতুন সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণের বোঝায় ভুগছে এমন ব্যাংক খাত পুনর্গঠন এবং বৈদেশিক সহায়তা বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সাধারণ ও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন কমিটিতে দায়িত্ব এবং ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছে, যা সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এই প্রত্যাশা নতুন সরকারের জন্য এখনই চাপ হিসেবে কাজ করবে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে দেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিদ্যুতের ভর্তুকি ও জ্বালানি তেল আমদানির দায়সহ বিভিন্ন বকেয়া পরিশোধ করেছে। এর ফলে বিপুল ঋণের বোঝা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সারের ভর্তুকিও বাড়ানো হয়েছে, যা সরকারের ব্যয় বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ব্যয় কমানো হয়েছে। ফলে দেশের ভেতরের চাহিদা কমেছে। এডপির ব্যয়ে গতি আনতে নির্বাচিত সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়ানোও নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক মন্দা ও শিল্প খাতে সংকটও নতুন সরকারের জন্য চাপ তৈরি করছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি বড় শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং নতুন বিনিয়োগ হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। নতুন সরকারকে এই বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে তোলা, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উদ্বুদ্ধ করা নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া বৈদেশিক সহযোগিতা বাড়ানোও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় উগ্রতা নিয়ন্ত্রণ করাও সরকারের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনাও জটিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ দেশের বড় রাজনৈতিক দল। তাদের নিষিদ্ধ রেখে দেশ পরিচালনা করা সহজ হবে না। আবার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঝুঁকিও সরকার সহজে নিতে পারবে না। একই সঙ্গে, নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখে বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নও কঠিন হবে। কারণ বিভিন্ন দেশ আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় সরকারের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে আগ্রহী নাও হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি ও বাজেট চাপ নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। অক্টোবর মাসে এটি ছিল ৮.১৭ শতাংশ। কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ওঠানামার মধ্যে থাকলেও ৮ শতাংশের ঘরেই বেশি সময় ধরে ঘোরাফেরা করছে। আগামী রমজানে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় কমানো হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দের মাত্র ৬৭.৮৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে, যা দেড় দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা, তবে সেখান থেকেও ব্যয় তেমন হচ্ছে না। জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত এডিপির বরাদ্দের মাত্র ১১.৭৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে, যা এতদিনের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এডিপি ব্যয়ের ধীরগতি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা দিচ্ছে এবং বেসরকারি খাতের পণ্যের চাহিদা কমাচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী সরকারকে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে হবে। সেই ব্যয় করতে গেলে অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, নির্বাচিত সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। বিনিয়োগ বাড়াতে রাজস্ব সংগ্রহও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পরিবেশ উন্নত করতে হবে এবং আস্থা অর্জন করতে হবে। প্রথমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। তিনি বলেন, ‘সরকার ব্যয় বাড়ালে তা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। তাই সেটিও সামলানো নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ।’
নতুন সরকারের জন্য রাজস্ব সংগ্রহ ও ঋণ চাপ :
নির্বাচিত সরকারের জন্য রাজস্ব সংগ্রহ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্বে ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সরকার ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এখনও ২৪ হাজার ৪৭ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বিপুল ঋণ করছে, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ সুদের ঋণও।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেছেন, নির্বাচিত সরকারকে রাজস্ব সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ‘বর্তমান সরকারের সময়ে রাজস্ব খাতে যে অগ্রগতি আশা করা হয়েছিল, তা এখনও দৃশ্যমান হয়নি। রাজস্ব বোর্ডকে বিলুপ্ত করে দুই বিভাগে ভাগ করা হয়েছে, কিন্তু কবে কীভাবে কার্যক্রম শুরু হবে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে বাংলাদেশ এখনও নিম্ন কর ভিত্তি ও অস্বচ্ছ কর ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে। নতুন সরকারের জন্য বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহ করা সহজ হবে না।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচিত সরকারের ওপর আরও বাড়তি ব্যয়ের চাপ থাকবে। নতুন সরকার বিদেশি ঋণের পুরানো বৃত্তের মধ্যেই থাকতে পারে। এর ফলে অর্থনৈতিক পরিচালনায় জটিলতা আরও বেড়ে যাবে।
নতুন সরকারের জন্য সরকারি বেতন ও বাজার :
নতুন সরকারের জন্য জনপ্রশাসনে ব্যয় নিয়ন্ত্রণও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। বর্তমান সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য নতুন পে-কমিশন গঠন করেছে। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো চালু করার পরিকল্পনা থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। ফলে আগামী সরকারকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির দায়িত্ব নিতে হবে।
সর্বশেষ ২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন সর্বনিম্ন বেতন ৭০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১০ বছর পর বর্তমান বেতন কমিশন একই ধরনের প্রস্তাব দিলেও সরকারের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকা বাড়বে। পেনশন বাবদ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়বে। বিশেষত যেসব খাতে সরকার ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে, সেখানেও বেতন বাড়ার চাপ তৈরি হবে। সামগ্রিকভাবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেতন বৃদ্ধি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াবে। সেই চাপ সামলানোও নতুন সরকারের বড় দায়িত্ব হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা:
নতুন সরকার আর্থিক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা করতেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে থাকবে। বর্তমান সরকার সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামের নতুন ব্যাংক চালু করেছে। নতুন ব্যাংকের জন্য বাজেট থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন দেওয়া হয়েছে। এই ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া ও ঋণগ্রহীতা থেকে অর্থ আদায় নিশ্চিত করার দায়িত্ব নতুন সরকারের ওপর থাকবে।
গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ। ১৭টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার মোট ঋণের ৫০ শতাংশের বেশি। অতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে এসব ব্যাংক মূলধন সংকটের মুখোমুখি। পাশাপাশি কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানিও সমস্যায় জর্জরিত।
সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পরে যে ইতিবাচক ধারার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা দেখা যায়নি। রাজস্ব সংগ্রহে কোনো বিশেষ উন্নতি হয়নি। সরকারি ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সরকার পরিশোধ ক্ষমতা বিবেচনা না করেই ঋণ নিচ্ছে। ব্যয় বাড়তে পারে এমন পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী সরকারকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো, ঋণ পরিশোধ, অতিরিক্ত ব্যয় সামলানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগকে গতিশীল করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।’

