চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এ বছর দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে সাময়িক এই মন্থরতার পর আগামী অর্থবছরে অর্থনীতি কিছুটা গতি পাবে বলে মনে করছে সংস্থা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস জানুয়ারি সংস্করণে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এই মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক চাপ সত্ত্বেও ভোক্তা ব্যয় বেড়ে যাওয়া, মূল্যস্ফীতির চাপ ধীরে ধীরে কমে আসা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমলে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ধারণার কাছাকাছি। এডিবি জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার সংশোধিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সহজ হবে না। পাঁচ মাস ধরে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় নেতিবাচক। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ দুর্বল। এই পরিস্থিতি থেকে বেরোতে না পারলে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো কঠিন হবে।
র্যাপিডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও চাপ এখনও বড়। এই পরিস্থিতিতেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ হওয়া উচিত ছিল। তবে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে রিজার্ভ শক্তিশালী করা, মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমাতে হবে।”
বিশ্বব্যাংকও মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের চাপের বিষয়টি তুলে ধরেছে। সংস্থার মতে, লক্ষ্যনির্ধারিত তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় মুদ্রানীতি কঠোর করা হয়েছে। এতে ঋণের প্রবাহ কমেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে প্রভাব পড়ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে সংস্থাটি মনে করছে, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমবে। নির্বাচনের পর নতুন সরকার কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে এগোলে শিল্প খাত ও বিনিয়োগ পরিবেশ শক্তিশালী হতে পারে। এ কারণে আগামী অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ভুটানে; ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। ভারতের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় সাড়ে ৩ শতাংশ, মালদ্বীপে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং নেপালে ২ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের জন্য নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেয়নি সংস্থা।
এদিকে বিবিএস হিসাবেও কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ২.৫৮ শতাংশ। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে গতি ফেরার আভাস দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বৈশ্বিক অর্থনীতির চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থা বলেছে, বাণিজ্য উত্তেজনা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২.৬ শতাংশ হলেও ২০২৭ সালে তা ২.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেছেন, স্থবিরতা ও বেকারত্ব এড়াতে সরকারগুলোকে বেসরকারি বিনিয়োগ, বাণিজ্য উদারীকরণ ও প্রযুক্তি ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

