অর্থনীতিতে ঝুঁকি সবসময় থাকে। তবে আগে থেকে চিহ্নিত করলে তার প্রভাব মোকাবিলা সহজ হয়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম মনে করছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি হবে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতা।
প্রতিবেদনে প্রতিটি দেশের জন্য পাঁচটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে দ্বিতীয় প্রধান ঝুঁকি হলো ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত, যেমন নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও বিনিয়োগ যাচাই-বাছাই। তৃতীয় ঝুঁকি মূল্যস্ফীতি। দেশে প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭৭ শতাংশ।
চতুর্থ ঝুঁকি অর্থনৈতিক ধীরগতি। ফোরাম বলছে, এটি মন্দা বা স্থবিরতার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। পঞ্চম ঝুঁকি ঋণ—সরকারি, করপোরেট ও পারিবারিক। বাস্তবতা হলো, গত কয়েক বছরে দেশের ঋণের বোঝা বাড়ছে। জাতীয় বাজেটের প্রধান অংশ এখন ঋণের সুদ পরিশোধে যাচ্ছে। এই চাপ ক্রমবর্ধমান। তাই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রকাশিত গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট-২০২৬ স্বল্পমেয়াদী বিভিন্ন ঝুঁকি তুলে ধরেছে। এখানে দেশভিত্তিক ঝুঁকির পাশাপাশি বৈশ্বিক ঝুঁকিও চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিটি দেশের ঝুঁকি নির্ধারণে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে জরিপ পরিচালনা করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের ১০২টি কোম্পানির ব্যবসায়ী ও নির্বাহীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। সারা বিশ্বে একই প্রশ্নমালায় এটি করা হয়। সেখান থেকেই ঝুঁকির তালিকা তৈরি হয়েছে। জরিপটি করা হয়েছিল ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত। ৩৪টি বিষয়ে আগামী দুই বছরের ঝুঁকি চিহ্নিত করতে বলা হয়েছিল।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, তখন দেশের কোম্পানিগুলো অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সে সময় চাঁদাবাজি, লুটপাট ও ছিনতাই বেড়ে গিয়েছিল। তবে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। তিনি বলেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমেছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অর্থনৈতিক ধীরগতির শঙ্কা কিছুটা কমেছে। বিশ্ব ব্যাংক বলছে, চলতি অর্থবছরে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি হবে ৪.৬ শতাংশ।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান তখনকার অসন্তোষের কারণে ঘটে। মানুষ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে বোধ করেছিল। উন্নত জীবনের আশা হারানোর ক্ষোভ দেশজুড়ে বিক্ষোভে রূপ নেয়। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনা দেখা গেছে।
বৈশ্বিক ঝুঁকি:
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বৈশ্বিক স্তরে বড় ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে। ২০২৬ সালে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ঝুঁকি হবে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত। এরপরের চারটি ঝুঁকি হলো রাষ্ট্র সংঘাত, চরম আবহাওয়া, সামাজিক মেরুকরণ এবং ভুল তথ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে। স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বেশি। মন্দা ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি উভয়ই বেড়েছে। এআই নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। পরিবেশগত ঝুঁকি স্বল্পমেয়াদে কিছুটা কমেছে।
গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, জরিপ মূলত কোনো দেশের অর্থনীতির কাঠামো বোঝার জন্য করা হয়। কাঠামো রাতারাতি বদলায় না। তবে বৈশ্বিক ও দেশি পরিস্থিতি এখন টালমাটাল। অনেক কিছু বদলাচ্ছে। উদীয়মান দেশগুলোর জন্য এক সময় মূল্য চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত। এখন সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি বেশি চ্যালেঞ্জিং।
বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা সংকটে:
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা চাপের মুখে। পারস্পরিক আস্থা কমছে। স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের প্রতি সম্মান কমছে। সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সুরক্ষাবাদ যুক্ত হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ হুমকির মুখে। সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

