বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে ১৪টিই বোয়িংয়ের তৈরি। অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, বোয়িং বিমানকে মোট ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ সরবরাহ করবে। এর মধ্যে থাকবে দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮।
বিমান ও মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের মধ্যে চলতি মাসেই চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির সূত্র জানায়, বোয়িংয়ের প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে ডেলিভারি দেওয়ার কথা। বাকি উড়োজাহাজগুলো ২০৩৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি বিমানের পরিচালনা পর্ষদ বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের দেওয়া প্রস্তাবটি আপাতত গুরুত্ব হারিয়েছে।
বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম উড়োজাহাজ সরবরাহের সময়সূচির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি ও অন্যান্য প্রক্রিয়াগত বিষয়ে এখন আলোচনা চলছে। তার ভাষায়, পর্ষদের সিদ্ধান্তের পর চুক্তি সই ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করাই এখন মূল কাজ। এ সময় উড়োজাহাজের দাম নির্ধারণই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
অর্থায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে বোসরা ইসলাম বলেন, ব্যাংকঋণের জন্য রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল ইস্যু করা হবে। যে ব্যাংক সবচেয়ে কম সুদে ঋণ দিতে আগ্রহী হবে, তাদের সঙ্গেই চুক্তি করা হবে।
গত ৩০ ডিসেম্বর নীতিগত অনুমোদনের আগে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ বোয়িংয়ের ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বরের প্রস্তাব এবং ২০ ডিসেম্বরের সংশোধিত খসড়া চুক্তি পর্যালোচনা করে।
লিজ বা ইজারার মাধ্যমে উড়োজাহাজ সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে সংকটে রয়েছে বিমান। এর প্রভাব পড়েছে ফ্লাইট পরিচালনায়। অনেক রুটে ফ্লাইট কমেছে। নতুন রুট চালু করাও পিছিয়ে পড়েছে।
পর্ষদের অনুমোদনই শেষ ধাপ নয়
তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমানের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, পর্ষদের অনুমোদন পেলেই উড়োজাহাজ নিশ্চিত হয়ে যায় না। এর পরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এই অনুমোদন মূলত একটি জটিল চুক্তি ও আর্থিক প্রক্রিয়ার সূচনা। তার ভাষায়, পর্ষদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ধাপ নয়। এর আগে ও পরে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি থাকে।
তিনি জানান, উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে সাধারণত মোট দামের প্রায় ১০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হয়। এই অর্থের সংস্থান বেশিরভাগ সময় ব্যাংক ঋণের মাধ্যমেই করা হয়। ডাউন পেমেন্ট পরিশোধ এবং চুক্তি সইয়ের পরই কোনো অর্ডার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত ধরা হয়।
২০০৭ সালে বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমানের চুক্তির অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন ওয়াহিদুল আলম। তিনি বলেন, সে সময় চুক্তি প্রক্রিয়া ছিল জটিল। শুরুতে ঢাকায় চুক্তি সইয়ের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগে গিয়ে তা সম্পন্ন করতে হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, সরকার পরিবর্তনের মতো রাজনৈতিক বিষয়ও এ ধরনের বড় চুক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার সময় তারা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন।
বিমানের কর্মকর্তারাও বলছেন, পর্ষদের অনুমোদন কেবল আলোচনার দরজা খুলে দেয়। আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত এর কোনো আইনি বা আর্থিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না।
এয়ারবাস প্রস্তাব নিয়ে অনিশ্চয়তা
এদিকে এয়ারবাস বিমানকে ১০টি এ৩৫০ ওয়াইড-বডি এবং ৪টি এ৩২০ নিও ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে এই প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম জানান, যেহেতু বোয়িংয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে, তাই আপাতত অন্য প্রস্তাবগুলো নিয়ে এগোনোর সম্ভাবনা কম। তার মতে, এই মুহূর্তে এয়ারবাসের প্রস্তাব নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।
বোয়িংয়ের সিদ্ধান্তের পর এয়ারবাসের প্রস্তাব বাতিল হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে এয়ারবাসের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে জানায়, পর্ষদের সিদ্ধান্তের বিষয়টি তাদের অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। তবে প্রস্তাব বাতিল বা অন্য কোনো বিষয়ে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়নি।
বহর কৌশল নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বোয়িং কেনার ফলে বিমানের দূরপাল্লার বহর আধুনিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় উড়োজাহাজের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাণিজ্যিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক এয়ারলাইন নির্বাহী উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বোয়িং ৭৮৭ ও ৭৭৭ যুক্ত হওয়ায় জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে। কিন্তু বহরের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তার ভাষায়, সব রুটে সারা বছর ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ চালানো লাভজনক নয়। কম যাত্রীর রুটে বড় প্লেন চালালে আসন ফাঁকা থাকে। এতে রাজস্ব ক্ষতি হয়।
তিনি বলেন, অনেক আঞ্চলিক ও মাঝারি যাত্রীর রুটে এয়ারবাস এ৩২১ নিও বা বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্সের মতো ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ বেশি কার্যকর। বিশ্বের বড় এয়ারলাইনগুলো মিশ্র বহর পরিচালনা করে। বিমানেরও সেই পথেই হাঁটা উচিত।
শুধু বহরের আকার বড় হলেই বড় এয়ারলাইন হওয়া যায়—এই ধারণাও নাকচ করেন নজরুল ইসলাম। তার মতে, ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো এবং বাজারে উপস্থিতি বজায় রাখাই আসল কৌশল।
ওয়াহিদুল আলমও একই মত দেন। তিনি বলেন, শুধু বোয়িংয়ের ওপর নির্ভর না করে ভারসাম্যপূর্ণ বহর গড়া জরুরি। সব রুটে বড় উড়োজাহাজ চালানো বাস্তবসম্মত নয়।
ভূরাজনীতি ও বাজারের চাপ
বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের পেছনে ভূরাজনৈতিক প্রভাবও কাজ করেছে। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক আলোচনা চলাকালে সরকার একটি বৃহত্তর বাণিজ্য সমঝোতার অংশ হিসেবে ২৫টি পর্যন্ত বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
এই বক্তব্যের পর ইউরোপীয় কূটনীতিকরা বাংলাদেশে এয়ারবাসের বাজার বাড়াতে তৎপরতা জোরদার করেন। এয়ারবাস কেনার আলোচনা শুরু হয়েছিল আগের সরকারের আমলে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরের সময় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ প্রকাশ্যে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও জানান।
বাংলাদেশের এভিয়েশন বাজার দ্রুত বাড়ছে। তবে স্থানীয় এয়ারলাইনগুলোর দখলে রয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ বাজার। এই বাস্তবতায় বহর সম্প্রসারণ ও পুনর্গঠনের চাপ বাড়ছে বিমানের ওপর।
সব মিলিয়ে আপাতত বোয়িংই শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এয়ারবাস কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।

